J Haydar
হয়তো তোমাকে হারিয়ে দিয়েছি
নয়তো গিয়েছি হেরে,
থাক না ধ্রুপদী অস্পষ্টতা
কে কাকে গেলাম ছেড়ে..
-- হেলাল হাফিজ।।
হয়তো তোমাকে হারিয়ে দিয়েছি
নয়তো গিয়েছি হেরে,
থাক না ধ্রুপদী অস্পষ্টতা
কে কাকে গেলাম ছেড়ে.....
-- হেলাল হাফিজ।।
12/05/2026
" আপনি " পার্ট - ৫
কফি নিতে চাচ্ছো?
হলে মন্দ হয়না। হেসে জবাব দিল স্নিগ্ধা।
- কিচেন এই দিকে, তর্জনী আঙ্গুল উঁচু করে উঠিয়ে দেখিয়ে দিল জামিল। বলল, মুন্নির মাকে ছুটি দেয়া হয়েছে। তারা আজ দুপুরে বাইরে খাবে। কফি তিন কাপ হলে ভালো হয়!
স্নিগ্ধা আবার হাসলো।
- আমি কি আপনাদের সাথে আজকের দিনটার অংশ হতে পারি?
- অবশ্যই পারো। তবে তার আগে তোমাকে আজানের থেকে অনুমতি নিতে হবে। খুব সম্ভবত সে চাইবে না, তার আর তার পিতার মাঝে তৃতীয় কেউ থাকুক। যদি আজান না চায় তাহলে সরি স্নিগ্ধা, সেখানে কারোই প্রবেশাধিকায় নেই।
স্নিগ্ধা তাকালো আজানের দিকে। আজান তার গালে হাত দিয়ে এক দৃষ্টিতে কচ্ছপের দিকে তাকিয়ে আছে। আশ্চর্য এই ছেলের বিষ্ময় শেষ হবে কখন?
শেষ অবদি আজান স্নিগ্ধাকে সঙ্গে নিয়েছে। শুধুই সঙ্গে নেয়নি সে এখন তার হাত ধরে আছে। তারা এখন ঢাকার কাটাবনে। আজানকে আরো একটি কচ্ছপ কিনে দিয়েছে স্নিগ্ধা। জামিল কিনে দিয়েছে খাঁচায় বন্দি দুটো পাখি। এই দুটো হচ্ছে ফিঞ্চ। এরা সাধারনত ৬-৮ বছর বেঁচে থাকে। আজান খুশি। বাচ্চারা আসলে অপ্লতেই খুশি হয়,আবার অল্পতেই কাঁদে। বড়রাও অল্পতেই খুশি হয়, সুখি হয়। তবে বড়রা অল্পতেই কাঁদেনা, কাঁদতে পারেনা।
তারা এখন বসে আছে রমনায়। আজান পাখি সামনে নিয়ে ঘাসের উপরে বসেছে। গভীর আগ্রহের সাথে সে তাকিয়া আছে ফিঞ্জের দিকে। পাখি দুটো ছটফট করছে। জামিল তাকিয়ে বলল, এরা ছটফট কেন করছে বলতে পারবে? আজান তার পিতার দিকে তাকিয়ে বলল, আমিও তাই ভাবতেছি বাবা। এরা ছটফট করছে কিসের জন্য? বাচ্চারা এ বয়সে প্রশ্ন করে। তাদের প্রশ্নের জবাব আসলে যেটা হওয়া উচিত সেটাই দিতে হয়। ঘুড়িয়ে বলতে হয়না, এড়িয়ে যেতে হয় না। পিতা মাতাদের উচিত সন্তানদের দিয়ে প্রচুর প্রশ্ন করানো। এই পৃথিবীতে যা যা মানুষের থেকে সৃষ্টি হয়েছে তা প্রশ্নের থেকেই হয়েছে। প্রশ্ন মানেই নতুন কিছু জানা। নতুন কিছু শেখা।
জামিল বলল, ওরা মুক্ত আকাশে উড়তে চাইছে। এদেরকে বন্দি করে টাকার বিনিময়ে তোমার কাছে বিক্রি করা হয়েছে। তুমি এখন এই দুটোর মালিক। এদের মুক্তি তোমাকে প্রশান্তি দিবে, আর এদের কারাগার তোমাকে দিবে প্রভুত্ব। তুমি যেটা চাইবে এদের সাথে তাই করতে পারবে। সিদ্ধান্ত তোমাকেই নিতে হবে, তুমি প্রভুত্ব দেখাবে নাকি মুক্তি দিবে? তুমি যেটাই করবে সেটা অপরাধ না। সিদ্ধান্ত তোমার তুমি প্রশান্তি চাও নাকি প্রভুত্ব। দুটোর মজাই দু'রকম।
আজান তাকিয়ে আছে বাবার মুখের দিকে। জামিল খেয়াল করছে আজানের চোখে মুখে চিন্তার ছায়া পড়েছে। এ ছেলে তার মায়ের মত, প্রবল আগ্রহ নিয়ে কথা শোনে। ডিফ্রেন্ট এটুকু আজান শুনে মুগ্ধ হয়ে, আর সে শুনতো কথা মনে রেখে পরে কথা শুনানোর জন্য!
আজান পাখি নিয়ে দূরে বসে আছে। সে কিজানি কি ভাবছে। স্নিগ্ধা জামিলের মুখোমুখি।
- আজান তার মায়ের মত দেখতে হয়েছে তাইনা?
জামিল তাকালো স্নিগ্ধার দিকে। ছোট স্বরে জবাব দিল, হ্যাঁ ওর মায়ের মত দেখতে হয়েছে।
- সে তার মায়ের মত দেখতে হলেও চোখ পুরোপুরি আপনার মত।
জামিল মাথা নিচু করে চুপ করে আছে। লিনাও তাই বলতো। জামিল দীর্ঘশ্বাস ফেললো তবে সে দীর্ঘশ্বাস নিয়মের বাইড়ে। দম নিয়েছে নিয়মের মতো, কিন্তু ছেড়েছে ধীরে ধীরে। দীর্ঘশ্বাসের শব্দ অন্যকে শুনাতে নেই।
- বিয়ে করবেন না ? প্রশ্ন স্নিগ্ধার।
জামিল কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল, না।
- এভাবে জীবন কাটিয়ে দেয়া যাবে? সম্ভব?
- কেন সম্ভব না? জামিল লিনার দিকে তাকাচ্ছেনা।জামিলের চোখ কেমন জানি হয়ে গেছে। সে চাচ্ছেনা তার চোখ এই মুহূর্তে স্নিগ্ধা নামক মেয়েটি এখন দেখুক।
স্নিগ্ধা তাকালো জামিলের দিকে, বলল - আপনার যদি খুব অসুবিধা না হয় আমাকে বলা যাবে আপনার এমন সিদ্ধান্তের কারণটা কি?
জামিল নিজের প্রতি নিজের নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে। সে স্নিগ্ধার প্রশ্নের জবাব দিবে। দেয়া উচিত।
জামিল বলল, মানুষের সম্পর্ক শেষ হয়তো হয় তবে টান কোথাও যেন একটা থেকে যায়। মানুষের অধিকার হয়তো শেষ হয়, কিন্তু বিশ্বাস শেষ হয় না। লিনা আমাকে ছেড়ে গেছে ঠিকি তবে আমি জানি সে আমাকে প্রবল ভাবে বিশ্বাস করে। সে বিশ্বাস করে, আমি তার ছাড়া আর কারো না। আমার পাশে সে নিজেকে ছাড়া আর কাউকেই চিন্তা করতে পারতো না,আমার ধারনা এখনো পারবেনা। আমার পাশে কেউ একজন এসে দাঁড়িয়েছে, আমার হাতে হাত রেখেছে এটা জানলে সে প্রচুর কষ্ট পাবে। স্নিগ্ধা আমি এই কষ্টটুকু তাকে কখনো দিবো না। তার বিশ্বাস নষ্ট করবোনা। বিশ্বাস ভাঙার শব্দ এতোই প্রবল হয়যে তা পৃথিবী ছাড়িয়েও চলে যায় অন্য কোনো ভুবনে। সে তার থেকে আমাকে যে বিশ্বাসটুকু দিয়েছিলো তা যদি না'ই রাখতে পারি,তাহলে তাকে ভালোবেসেছিলাম কবে? আমাকে ভালোবেসে যে সম্মানটুকু দিয়েছিল, আমার বাচ্চার মা হয়েছিলো তাকে এই সন্মানটুকু আমি দিবো। তার দেয়া বিশ্বাসটুকুই আমার কাছে সন্মানের। সে নেই কিন্তু কে বলেছে সে নেই। আছে তো। মানুষ মরে গেলেও থাকে। থাকতে হলে কাছে থাকতে হবে, পাশে পেতে হবে এভাবেই কেন আমাদের ভাবতে হবে?
স্নিগ্ধা তাকিয়ে আছে জামিলের দিকে এক দৃষ্টিতে। আজ লিনাকে তার খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। সে ভাবছে,ওই ভাগ্যবতী নারী কি বুঝতে পারে কেউ একজন তাকে এখনো কতটা ভালোবাসে?
হঠাৎ করে আজান দূর থেকে দৌড়ে এসে কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরল তার বাবাকে। স্নিগ্ধা অবাক হয়ে চোখে গাড় মমতা নিয়ে ভাবছে, এই ছেলে হঠাৎ কাঁদছে কেন?
জামিল তার ছেলেকে শক্ত করে ধরে আছে। জামিল তাকালো খাঁচার দিকে, দেখলো খাঁচার দরজা খোলা।
আজান তার পিতাকে শক্ত করে জড়িয়ে রেখে কাঁদতে কাঁদতে বলল, বাবা আপনি সত্যি বলেছিলেন। আমি পাখি দুটোকে মুক্তি দিয়েছি। তারা উড়ে চলে গেছে। বাবা আপনি সত্যি বলেছেন, ওদেরকে ছেড়ে দেওয়ার পরে আমার মনে অনেক শান্তি পেয়েছি। তাদের উড়তে দেখে মনে হয়েছে আমি একটি ভালো কাজ করেছি। আজান তার গলার স্বর আরো জোড়ালো করে বলল, বাবা আপনি দেখুন, আমি প্রভুত্ব গ্রহণ করিনি।
মুক্তি দেয়ার মত শান্তি প্রভুত্বে নেই। জামিল ফিস ফিস করে বলতে লাগলো, তোমার প্রভুত্বের অধীনে তাদের মৃত্যু দেখার চাইতে, তাদের মুক্তি তোমার কাছে সুখের।
আজান তাকালো স্নিগ্ধার দিকে। চোখ ভেজা। এখনো সে কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতেই স্নিগ্ধাকে বলল, আন্টি আমি কচ্ছপ দূ'টোকে মুক্ত করে দিলে তুমি কষ্ট পাবে?
স্নিগ্ধা হাটু গেড়ে বসলো আজানারে কাছে। বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলল, যেদিন বাবার মত অনেক বড় হবে সেদিন মুক্ত করে দিও। ওদের এই মুক্তির অপেক্ষা তোমার ভালো পথের প্রেরণা হবে। ভালো কাজের নিয়ত হলেই ঈশ্বর সেটাকে আগে থেকেই লিখে রাখেন।
লিনার ড্রাইভার আজানকে নিতে এসেছেন। রাত গভীর হয়নি এখনো। সন্ধ্যা পেড়িয়ে রাতের পথে।
স্নিগ্ধা দাঁড়িয়ে আছে। জামিলের কাধে সন্তানের ব্যাগ। ডান হাতে এ্যাকুরিয়াম, বাম হাতে আজানের হাত ধরেছে সে। আজানের হাতে পাখি শূন্য খাঁচাটি। সে ওটা সাথে করে নিজে যাচ্ছে। ওটা কখনোই নষ্ট হতে দেবে না সে , কখনোই না। স্নিগ্ধা একদৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল।
আজান চলে যাচ্ছে। একবারও সে তার বাবার দিকে জানালা দিয়ে তাকায়নি। তার ধারনা তার বাবা কাঁদছে। সে তার বাবার চোখের পানি দেখতে চায়না হয়তো এই কারণেই সে তাকায়নি একবারও। আজান খাঁচাটি শক্ত করে ধরে বসে আছে। সে তার বিদায় বেলা তার বাবার দুইটি উপদেশ মনে করছে,
০১. তোমার মা যখন রেগে যাবে এবং একই সাথে প্রচুর কথা তোমাকে বলতে থাকবে তখন তুমি চুপ থাকবে। শুধু চুপ থাকবে না,মাথাও নিচু রেখো। বাবা মনে রেখো, অভিমানের চেয়ে রাগ বড্ড ভয়ঙ্কর। তোমার মা পৃথিবীর সেরা মা। সে নিজেই তোমার কাছে আসবে,তোমাকে কষ্ট দিয়ে সে ভুল করেছে এটা সে নিজেই ফিল করবে। ভুলেও তার মুখের উপরে কথা বলবে না। তাকে সব পরিস্থিতিতে সন্মান দেবে।
০২. বাবাকে নিয়ে তোমার মাকে কখনোই কোনো প্রশ্ন করবে না। তুমি নিশ্চয়ই চাও না তোমার মা মনে কষ্ট পাক। কোন ধরনের কোন প্রশ্ন তোমার মাকে করবে না। কোনো পরিস্থিতিতেই না।
এখন গভীর রাত। জামিল ছাদে দাঁড়িয়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছে। তার ফোন কাঁপতে শুরু করলো। ফোন করেছে স্নিগ্ধা। ফোন কানে তুলতেই স্নিগ্ধা বলল, জেগে আছেন জানতাম। প্রচন্ড মন খারাপ সেটাও জানি। কি করছিলেন?
- তেমন কিছুনা, ছাদে বসে ছিলাম।
- ঘুমাবেন না?
এই প্রশ্নের জবাব স্নিগ্ধাকে দেয়নি জামিল। ভারী কন্ঠে বলল, তোমার দিন ভালো লাগে নাকি রাত??
একটু নিরব থেকে স্নিগ্ধা উত্তর দিল, আমার রাতকে বেশি ভালো লাগে। কারণ রাত নিঝুম হয়, দিন নিঝুম হয়না।
স্নিগ্ধার কথা জামিলের পছন্দ হয়েছে। নিঝুম রাত মানুষকে অনেক দূরে নিয়ে যায়। নিঝুম রাতটুকুই হয়তো মানুষের নিজের। এই নিঝুম রাতেই ঈশ্বরকে পাওয়া যায়।
জামিলকে নিরব থাকতে দেখে স্নিগ্ধা বলল, আপনার কোনটা বেশি ভালো লাগে? দিন নাকি রাত?
জামিলের চোখ টলমল করছে। সে কাঁপাকাঁপা কন্ঠে বলল, রাত। এই রাতেই চাঁদকে খুব ভালোভাবে দেখা যায়। চেয়ে দেখো কি সুন্দর স্নিগ্ধ জোছনা দিয়ে যাচ্ছে।
স্নিগ্ধা বুঝতে পারছে, জামিল হয়তো কাঁদছে।
( চলবে..)
12/05/2026
তোমার প্রভূত্বের অধীনে তাদের মৃত্যু দেখার চাইতে, তাদের মুক্তি তোমার কাছে সুখের....
- "আপনি" থেকে নেয়া।
09/05/2026
"আপনি" চতুর্থ পর্ব
একটু আগেই লিনার ড্রাইভার এসে আজানকে নামিয়ে দিয়ে গেছে। এখন আজান জামিলের ঠিক পাশেই তার বাবার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আকাশ মেঘলা,বৃষ্টি হবে বোধহয়। আজানের আজ রাস্তার অসংখ্য মানুষের ভিড় অসহ্য লাগছে না, মনে কোনো ভয় হচ্ছেনা। তার মনে হচ্ছে কোনো গাড়ি এসে তার শরীরে উঠে আসবে না ,কারণ এখন সে তার বাবার হাত ধরে আছে। সে হয়তো বোঝে পৃথিবীতে এই একটি মাত্র হাত রয়েছে যে হাত পৃথিবীর সমস্ত হাতের সমষ্টির চাইতেও তার কাছে বেশি আস্থার।
জামিল মাথা নিচু করে আজানের দিকে তাকিয়ে বলল, কোথায় যাওয়া যায় বলোতো?
প্রশ্নটা আজানের খুব ভালো লেগেছে। কারন তার বাবা তার ইচ্ছের কথা জানতে চেয়েছে। তার পরামর্শ চেয়েছে। এতে বাচ্চারা ভাবতে শুরু করে যে, তার মতামতের গুরুত্ব রয়েছে। সে তার পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ একজন। সে শুধুমাত্র একজন'ই না তাদের পরিবারের ভবিষ্যতের ক্যাপ্টেন। বাচ্চারা মায়ের কাছে খোঁজে আশ্রয়, বাবার কাছ থেকে শেখে নেতৃত্ব, নির্দেশনা।
আজান জানেনা তার ঠিক কোথায় যেতে ইচ্ছে করছে। তবে সে এটুকু বোঝে, তার এখন যেখানে যেতে ইচ্ছে করছে সেটা তার বাবা বুঝতে পারছেনা। জামিল এখনো তাকে কোলে তুলে নিয়ে বুকের মধ্যে গুজে রাখেনি....
আজান মাথা না তুলেই ছোট্ট ছোট্ট শব্দে জবাব দিল, আপনার যেখানে ইচ্ছে।
জামিলকে আজান আপনি বলেই সম্বোধন করে। জামিল ভাবছে আজানওকি আপনি আর তুমির তফাৎ বোঝে??? সেও কি বুঝতে পারে, আপনি শব্দের মানেই আলাদা তুমি?
- আমাদের এখানে মেলা বসেছে। মেলায় গেলে কেমন হয়?
এবার আজান তার বাবার দিকে মুখ তুলল। তার চোখে মুখে কৌতুহল দেখা যাচ্ছে । কিছু কিছু হ্যাঁ বা না এর উত্তর চোখের দিকে তাকালেই বুঝতে পারা যায়।
এখন গোধূলি বিকেল। পৃথিবীতে গোধূলির আভা ছড়িয়ে গেছে। এই সময়টা শুধুই অনুভূতির।ফোনে রিং বাজছে। জামিলের ফোনে এই ধরনের টোন নেই। কার ফোন বাজছে?? জামিল খেয়াল করছে আজানের ব্যাগ থেকে শব্দটা আসছে। খুব সম্ভবত তার মা ব্যাগে করে এটা দিয়ে দিয়েছে ছেলের সাথে যোগাযোগের জন্য। মায়েরা এমনি হয়। যদিও সে জানে তার ছেলের হাত এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত হাতে। তবুও মা সে, মায়েরা এমনি হয়।আজান তার ছোট্ট ছোট্ট হাতে ব্যাগ থেকে ফোন বের করে কানে তুলতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসলো, কি করছো আজান?
মা এবং ছেলের একান্তই ব্যক্তিগত আলোচনায় উপস্থিত থাকাটা জামিল উচিত বলে মনে করেনি, ইশারায় জামিল আজানকে কিছু একটা বলল, সে ইশারার মানে হচ্ছে, তুমি কথা শেষ করো আমি পাশেই আছি। সে বারান্দায় গিয়ে গ্লাস টেনে দিল।
- বাবার সাথে বসে ছিলাম।
- তিনি এখন তোমার পাশে নেই তাইনা??? লিনা মনে মনে ভাবছে, পৃথিবীতে তার'চে ভালো জামিলকে আর কেউ চেনেনা। এ মানুষ পাশে বসে মা এবং ছেলের ব্যক্তিগত কথা শুনবে, এমন মানুষ তিনি নন।
- হা বাবা এখন এখানে নেই।
দীর্ঘশ্বাস ফেলল লিনা। দীর্ঘশ্বাসের যদি কোন নাম বা ধরন থাকতো তবে এই দীর্ঘশ্বাস "মায়ার" কাতারে যেত।
- দুপুরে খেয়েছো? প্রশ্ন লিনার।
- হ্যাঁ খেয়েছি তো।
- কি খেলে?
- ঘি দিয়ে গরম ভাত আর সাথে ডিম ভাজা। জানো মা আমি ডিম ভাজতে বাবাকে সাহায্য করেছি। বাবা বলেছেন, পরের ডিম ভাজিতে সে আমাকে সাহায্য করবে। তার মানে হচ্ছে, পরের ডিমটা আমি ভাঁজবো বাবা দেখবেন ঠিক ভাবে হচ্ছে কিনা। বিষয়টা ইন্টারেস্টিংনা মা?
- হ্যাঁ অনেক ইন্টারেস্টিং।
লিনা বুঝে গেছে আজান খুব আনন্দেই তার বাবার সাথে আছে। জামিলের সাথে আজান ভালো থাকবে এটা তার জানা। জামিল স্পেশাল কিছু তার জন্য করবেনা তবে এমন কিছু করবে, যেটা আজান কখনোই ভুলতে পারবে না।
লিনা বলল, কাল তোমার জন্মদিন। কিন্তু আমি চাচ্ছিনা কাল তোমাকে কল করতে। আমি চাচ্ছি এই দিনটায় তুমি তোমার বাবার সাথে সময় কাটাও। আমি ফোন না দিলে তোমার কি মন খারাপ হবে?
আজান ধীর কন্ঠে জবাব দিল, আমার মন খারাপ হবেনা মা। আমার মনে হচ্ছে তুমি ফোন করলে আমার বাবা আমাকে রেখে কিছু সময়ের জন্য হলেও দূরে চলে যাবে.......সেটা আমি চাচ্ছিনা।
লিনা চুপ করে আজানের কথা শুনছে। তার চোখ ছলছল করছে। সে ভাবছে, এ ছেলে একদম তার বাবার মত করে কথা বলে।
রাত ১২ টা জিরো আওয়ার। আজ আজানের জন্মদিন। এখন তারা বসে আছে রশিদ চাচার দোকানে। আজান ঠিক করেছে আজ রাতে সে ঘুমাবেনা। সে তার বাবার সাথে কথা বলেই কাটিয়ে দিবে। আজানকে আইস্ক্রিম কিনে দিয়েছে জামিল। এতো রাতে আইস্ক্রিম খেলে ওর ঠান্ডা জনিত সমস্যা হতে পারে এ কথা জামিল পাত্তা দিচ্ছেনা। ছেলে বসে তৃপ্তি সহকারে আইসক্রিম খাচ্ছে জামিল তা দেখছে। একজন পিতার কাছে এই দৃশ্য কতোটা শান্তির তা কেবল পিতাদের'ই জানা।
চারপাশে বাতাস বইতে শুরু করেছে, ঝড় আসবে বোধয়। রোড ঘাট কেমন নীরব,নিস্তব্ধ।
ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। আজানের আইস্ক্রিম এখনো শেষ হয়নি। আজানের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে জামিল বলল, বৃষ্টিতে ভিজবে?
আজান এটুকু তার মায়ের কাছে জেনেছে যে, তার বাবা কখনো মিথ্যে বলেন না, কাউকে মিথ্যে সান্ত্বনাও দেন না। তবুও আজান অদ্ভুত কৌতুহলী চোখ নিয়ে তার বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, সত্যি বলছেন বাবা?? এমন ইন্টারেস্টিং প্রস্তাব সে এখন আশা করেনি।
জামিল মনে মনে ভাবছে, আমাকে একবার যদি তুমি বলে ডাকতে, একবার। বলে কয়ে সম্বোধন আদায়ের মধ্যে কোন তৃপ্তি থাকে না। জামিল তাকে কখনোই বলবেনা, বাবা আমাকে একবার তুমি বলে ডাকো।
- হ্যাঁ সত্যি বলছি।
এবার আজানের চোখ আনন্দে চকচক করছে। ওর মা বলতো আমার ছেলের চোখ ঠিক তোমার মত দেখতে...
- তবে তোমার জ্বর আসতে পারে, ভেবে দেখো ভিজবে কিনা?
- আসুক,বাবা চলেননা ভিজি, এই প্রথম জামিল তার সন্তানের বাচ্চা সূলভ আচরণ দেখতে পেল সাথে একজন পিতার কাছে তার সন্তানের অনুরোধ। তার এমন আবদার সে অগ্রাহ্য করবে কোন বিবেচনায়? আমরা মানুষ,আমরা সৃষ্টির সেরা। সৃষ্টির সেরা জীবেরা যদি সামান্য জ্বরকে ভয় পাই তবে বৃষ্টিতে ভেজার এমন অসাধারণ সুন্দর মুহূর্ত গুলোর জন্ম হবে কোথ্যেকে ? জামিল চাচ্ছে না তার সন্তানের আবদার পূরন না করেই তাকে ফিরিয়ে দিতে। তাছাড়া কি এমন চেয়েছে সে?? প্রকৃতিও হয়তো তাই চাইছে। নয়তো এই দিনে এই সময়েই কেন তাকে ঝড়তে হবে?
ঝুম বৃষ্টি। তার দুজনে রাস্তায় নেমে গেছে। আজানের হাতে আইস্ক্রিম। একটি ছয় বছরের বালক গভীর রাতে আইস্ক্রিম হাতে নিয়ে রাস্তায় নেমে বৃষ্টিতে ভিজছে, সাথে তার বাবা। এটাই এই মূহুর্তে দুনিয়ার সেরা দৃশ্য, এটা অস্বীকার করতে পারবেন????
বাবা ছেলেকে ভিজতে দেখে রশিদ চাচার খুব ভালো লাগছে। অপলক তাদের দুজনকে দেখছে। এমন মূহুর্তরা বার বার ফিরে আসুক।
রশিদ চাচা ভাবছেন এমন সুন্দর দৃশ্য যদি স্মৃতি করে না রাখি তবে প্রকৃতির কাছে সে কি জবাব দিবে?? উনি ফোন বের করে কয়েকটি ছবি তুলে নিলো। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, বাবা ছেলে খুব আনন্দ নিয়ে গভীর রাতের বৃষ্টিতে ভিজছে। শিশু বালকের হাতে আইস্ক্রিম।
জামিলের চোখে পানি। ঠিক কি কারনে তার চোখে পানি এটা সে নিজেই বুঝতে পারছেনা। আজান তা দেখতে পারছেনা, কারণ বৃষ্টি হচ্ছে। আজান মনে মনে চাচ্ছে, এই বৃষ্টি আজ না থামুক।
আজান তার জন্মদিনের রাতে বাবার হাত ধরে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে রাস্তায় রাস্তায় হাঁটছে এই স্মৃতি সে জীবনভর মনে রাখবে।
রাত ১.৩০ মিনিট। জামিলের ফোনে বাজছে। ফোন করেছে স্নিগ্ধা। জামিল ভাবছে এতো রাতে এ মেয়ে কেন কল করেছে? গভীর রাতে ফোনের টোন মনে ভয়ের জন্ম দেয়। প্রেমিক প্রেমিকাদের বিষয় আলাদা।
ফোন কানে তুলতেই ভেসে আসলো - ঘুমিয়ে গিয়েছিলেন ?
আতংকিত কন্ঠে জামিল জবাব দিল, না ঘুমাইনি, কি হয়েছে? এত রাতে তুমি?
- ভয় পেয়েছেন?
- একটু ভয় পেয়েছি।
হাসি কন্ঠে স্নিগ্ধা বলল, ভয় পাবার কিছু নেই। আমার মনে হচ্ছিল আপনি ঘুমান নি। তাই ফোন করলাম। আপনার অফিসে গিয়েছিলাম। আপনার ম্যানেজার বলল,আপনার ছেলে এসেছে। আপনি তাকে নিয়ে বিজি। আশা করছি এখন ব্যাস্ততা নেই।
- না নেই। কি দরকার আমাকে? কিছু হয়েছে?
- না কিছু হয়নি। কাল দুপুরে মা আপনাকে ডেকেছেন। তার ধারনা আপনি'ই প্রথম যিনি আমাদের বাসায় এসে কিছু না খেয়েই যেতে পেরেছিলেন।
জামিল স্নিগ্ধার কথার সাথে একমত না। সে বলল, ভুল বলেছো স্নিগ্ধা, আমি হয়তো দ্বিতীয়।
কোন কথা বলছেনা এখন স্নিগ্ধা, কি করে বলবে? কারণ সে জানে জামিল হয়তো সত্যি বলেছে। স্নিগ্ধা কে চুপ থাকতে দেখে জামিল বলল, কাল আমি দুপুরে (মানে আজ দুপুরে) আসতে পারছিনা স্নিগ্ধা। আমার ছেলের জন্মদিন। তাকে সময় দিতে চাচ্ছি।
স্নিগ্ধা খুশি মাখা কন্ঠে জবাব দিল, তাই???
জামিল এক শব্দে জবাব দিল, হ্যাঁ
ভাড়ি বর্ষন হবার ঠিক পরের মূহুর্তে প্রকৃতি যেমন সুন্দর আর শান্ত হয়ে যায় এখন ঠিক সে রকম। ছাদে বসে আছে জামিল এবং আজান। আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেছে। এখন চাঁদটাকে দেখা যাচ্ছে ঠিক রুটির মত। ঠান্ডা বাতাস বইছে। জামিল চাদর দিয়ে আজানকে ঢেকে রেখেছে। আজানের শরীর গরম হতে শুরু করেছে। জামিল চাদরটাকে সরিয়ে আজানকে বুকে টেনে নিয়ে আবার চাদর দিয়ে নিজেদের ঢেকে ফেলেছে। ঠিক এটাই আজান চাচ্ছিল। সে চাচ্ছিলো তার বাবা তাকে বুকে ধরে রাখুক,নিজের ভেতরে গুজে রাখুক। শরীর গরম তবুও আজানের অন্তর হিম শীতল ঠান্ডা।
জামিল আজানের দিকে তাকিয়ে দরদ ভরা কন্ঠে বলল,তোমার জ্বর আসতেছে বাবা।
আজান আধো আধো স্বরে বলল, আসতে দিন বাবা।
আজান হয়তো ভাবছে, তার জ্বর হলেই তার বাবা তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরবে, আরো শক্ত করে জরিয়ে রাখবে।
জামিল খুব আদরে আজানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে এখন। আজান ঘুমাচ্ছে। জামিল তাকালো চাদের দিকে, কি সুন্দর রুপালী জোছনা ছড়াচ্ছে।
সকাল ১১ টা। আজানের জ্বর কমেছে অনেকটা।গভীর রাতে জামিল ছেলেকে দু চামচ প্যারাসিটামল খাইয়ে দিয়েছিলো। ছেলেটা আরাম করে ঘুমাচ্ছে। জামিল তাকিয়ে ছেলের মুখটুকু দেখছে। দেখতে সে অবিকল তার মায়ের মত। জামিল চোখ সরালো। সন্তান্দের দিকে বাবা মায়ের এক দৃষ্টিতে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে নেই।
কলিং বেলের শব্দে আজানের ঘুম ভেঙেছে। আজ চোখ মেলেই সে তার বাবাকে দেখতে পেয়েছে। জামিল স্থির। সে খাবার সামনে নিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছে। আজান ভাবছে বাবা একবারও ডাকেনি কেন তাকে? জামিল ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল, এখন কেমন লাগছে বাবা???
- আজান মুচকি হাসলো। মানুষ ঘুম থেকে জেগেই সাথে সাথে কথা বলতে পছন্দ করেনা। মস্তিষ্ক কয়েক সেকেন্ড সময় চায়। তবে তার মা বলতো, জামিল বাড়িতে না থাকলে জেগে সঙ্গে সঙ্গে তাকে ফোন দিত। ঘুম ভাঙার পরে সেই ভারী কন্ঠ জামিলের খুব পছন্দের ছিল। জামিল অপেক্ষা করত সেই কণ্ঠস্বর শুনতে।
কে এসেছে?? প্রশ্ন আজানের।
দরজা খুলতেই জামিল দেখলো স্নিগ্ধা দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে একটি ছোট সাইজের এ্যাকুরিয়াম। তার মুখে হাসি। এই হাসির জন্য তাকে প্রাণবন্ত দেখতে লাগছে। জামিলের সামনে এই প্রথম হাসলো মেয়েটি।
ঘরে ঢুকেই আজানকে দেখতে পেল স্নিগ্ধা, সে হাত দিয়ে তার চোখ ডলছে।
- শুভ জন্মদিন আজান।
এখানে এতো মমতা নিয়ে এই নামে কে ডাকলো তাকে? ঘাড় ঘুরিয়ে এসে দেখতে পেল এক অসম্ভব সুন্দরী এক মেয়ে তাকে নাম ধরে ডেকেছে। তার হাতে একটি এ্যাকুরিয়াম, চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। মেয়েটি অতি সুন্দর বলেই কালো চশমাটি ফুটে উঠেছে। যেমন কপালে ফুটে থাকে কালো টিপ।
প্রচন্ড খুশিতে মানুষ কখনো কখনো চুপ হয়ে যায়। আজানের অবস্থা এখন ঠিক সেরকম। সে তার জন্মদিনে ছোট্ট একটি এ্যাকুরিয়াম পেয়েছে। তার ভেতরে একটি কচ্ছপের বাচ্চা। তার চোখে এখন বিস্ময়। জামিলের ধারণা, একজন পরিণত মানুষ কখনো বিস্মিত হয় না। সময়ের সাথে সাথে মানুষের থেকে বিস্ময় চলে যেতে থাকে। সত্যিকার ভাবে বিস্মিত হয় শুধুমাত্র বাচ্চারা। আজান কোনো শব্দ করছেনা।সে চোখে বিষ্ময় নিয়ে এখন কচ্ছপের দিকে তাকিয়ে আছে। বিস্মিত হওয়া চোখ দেখতে ভালো লাগে।
জামিল নিজেও স্নিগ্ধার এই বিষয়টাতে খুশি হয়েছে। এটা কচ্ছপ্টা হচ্ছে Turtle প্রজাতির। এরা ৮০ থেকে ১০০ বছর অনায়াসে বেঁচে থাকে। সে হয়তো চেয়েছে তাকে এমন একটা কিছু সে দিবে জেটা জীবন্ত এবং অনেক বছর ধরে বেঁচে থাকে। এ মেয়ের পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপারটা খুব তীব্র।
আজান তার গিফট হাতে নিতে নিতে বলল, আপনি আমার কে??
স্নিগ্ধা মুচকি হেসে জবাব দিল আমি তোমার, আন্টি হই।
আজান কচ্ছপ পেয়ে খুশি,তার কোনো দিকে খেয়াল নেই। আজান স্নিগ্ধার দিয়ে তাকিয়ে বলল, এ কচ্ছপ একা কেন??? ও একা থাকবে কি করে???
এই প্রশ্ন শুনে স্নিগ্ধা তাকালো জামিলের দিকে। জামিল হয়তো এই প্রশ্ন শুনতে পায়নি,অথচ সে আজানের খুব কাছেই বসে আছে। স্নিগ্ধা তাকালো আজানের দিকে, হলদে সাদা গায়ের রং, মুখে একটা মায়া আছে তার। এ ছেলে খুব সম্ভবত তার মায়ের মত দেখতে হয়েছে। শুধুমাত্র চোখগুলো অবিকল তার বাবার চোখের মত দেখতে।
- চলবে......
আমরা মানুষ,আমরা সৃষ্টির সেরা। সৃষ্টির সেরা জীবেরা যদি সামান্য জ্বরকে ভয় পাই তবে বৃষ্টিতে ভেজার এমন অসাধারণ সুন্দর মুহূর্ত গুলোর জন্ম হবে কোত্থেকে?
07/05/2026
"আপনি" পার্ট-৩
ফোন কাঁপছে। ইদানিং জামিলের ফোনের রিংটোনের শব্দ কেমন বিরক্ত লাগে। তাই এই ব্যবস্থা। যিনি ফোন করেছেন তার পরিচয় আপাতত জামিলের জানা নেই। অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন এসেছে। জামিল ফোন কানে তুলতেই এক তরুণীর কণ্ঠ। যে কন্ঠে প্রাণ নেই, যে কন্ঠে বিনয় নেই, সৌজন্যমূলক কোন সম্বোধন নেই।
- আপনি কি জামিল বলছেন????
জামিল কপালে ভাজ ফেলে ভাবতে লাগলো এই তরুণী কে হতে পারে? কোনো তরুণীর জামিলকে ফোন করার কথা না। তবে সে নাম বলেছে ঠিকঠাক। এ মেয়ের কন্ঠ এমন শুনতে লাগছে কেন???
- হ্যালো আপনি জামিল বলছেন?
জামিল মনে কিছুটা সংকোচ রেখেই জবাব দিল- হ্যা, কিন্তু আপনি কে ?
এই তরুণী জামিলের প্রশ্নের জবাব দেবার প্রয়োজন মনে না করেই বলল, আপনাকে মা এক্ষুনি বাসায় আসতে বলেছেন, উনি আপাতত বাড়িতে নেই তবে উনি আসতেছেন। আপনাকে বলতে বলেছেন এক্ষুনি বাসায় আসতে। তমাল এসেছে।
জটিল পরিস্থিতিতে বেশি কথা বলে নারীরা, পুরুষরা স্বাভাবিকের তুলনায় একটু কম। জামিলের আর বুঝতে বাকী নেই এই মেয়ে রেবেকা মীর্জার বড় মেয়ে। এর নাম খুব সম্ভবত স্নিগ্ধ। জামিল ভাবছে, শুরুতেই একজন অপরিচিত মানুষকে কোনো রকম সম্ভোধন ছাড়া নাম ধরে ডাকা এবং এমন কর্কশ কণ্ঠের অধিকারী একটা মেয়ের নাম স্নিগ্ধ হয় কি করে?? এর নাম হওয়া উচিত অগ্নি,শিখা এসব টাইপের কিছু! খুব সম্ভবত আচরনের দিক দিয়ে এ মেয়ে তার মায়ের বিপরীত।
- ও আচ্ছা তুমি স্নিগ্ধ?
মেয়েটি তীক্ষ্ণ স্বরে বলে উঠলো, একটি আকার আছে। আমার নাম স্নিগ্ধা, আর আমাকে তুমি করে কেন বলছেন? অপরিচিত একটা মানুষকে আপনি করে বলতে হয়, এই ম্যানারটুকু একজন সুস্থ মানুষের থাকা উচিত।
জামিল মনে মনে বলছে, সূর্যের চেয়ে বালি গরম! এই মেয়ের মেরুদন্ড একটু বেশি সোজা, তার আত্মসম্মানবোধ খুব সম্ভবত প্রবল।
জামিল বলল, ওই নেশাখোর ছেলের নাম তমাল?
- নেশাখোর কেন বলছেন? মানুষকে সন্মান দিতে শিখুন।
জামিল ভাবছে, সে ঠিক বলেছে মানুষকে সম্মান দেয়া উচিত। তবে এই কথাটা সে তার মাকে কখনোই কি বলেনি?
জামিলের ঠোটের কোনে মুচকি হাসি, এই মেয়ে অতটাও কর্কশ না যতটা সে ভেবেছিল।
- স্নিগ্ধা, ছেলেটা তোমাদের বাসার নিচে?
- না, এর আগে দুদিন দেখেছি বাড়ির নিচে দাঁড়িয়ে ছিলো। আজ উপরে এসে বেল দিয়েছে সরাসরি।
জামিল আগ্রহ নিয়ে বলল, সে কতো সময় হলো এসেছে? প্লিজ আমার প্রশ্নে রেগে না গিয়ে জবাব দাও,আমার যানা দরকার।
ওপাশ থেকে স্নিগ্ধা বিরক্তি ভরা কন্ঠে জবাব দিলো, প্রায় ১০ মিনিটের মত হবে।
জামিল আবার প্রশ্ন করলো, সে ক'বার কলিং বেল চেপেছে ?
স্নিগ্ধা এবার ডাবল বিরক্তির কন্ঠে বলল, দু,বার।
জামিল বলল, তৃতীয় বার বেল দেবার আগে দরজা খুলে তাকে ভেতরে বসতে দাও।
স্নিগ্ধা কিছু একটা বলতেই যাচ্ছিল কিন্তু জামিল তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল- স্নিগ্ধা মনে রেখো, প্রেমিকরা প্রেমিকার ভালোর জন্য তাকে ভুলে থাকতে পারে কিন্তু প্রেমিকার সামনে তাকে কেউ অপমান করেছে সেই অপমান তারা কোনোদিন ভুলতে পারেনা।
স্নিগ্ধা এখন চুপ হয়ে আছে। জামিলের কথা তার ভালো লাগতে শুরু করেছে, জামিলকে নিয়ে তার মনে থাকা সংসয় কিছুটা হলেও কেটেছে। তার মা হয়তো ভুল লোককে ডাকেনি......
ওপাশ থেকে জামিল বলল, শুনতে পেয়েছ??
এবার স্নিগ্ধা কোমল স্বরে বলল, জি শুনেছি।
জামিল ফোন রেখে মিন মিন করে বলল, যে ছেলে ১০ মিনিটে মাত্র দু'বার বেল চেপেছে কেউ এসে দরজা খুলবে শুধুমাত্র এই আশায়, তাকে এখনি বেয়াদব বলা যাচ্ছে না।
জামিল বসে আছে তমালের মুখোমুখি। কারো বিষয়ে ভালোভাবে বুঝতে গেলে তার সামনা সামনি হওয়া জরুরী, আলোচনার ক্ষেত্রে মুখোমুখি।
জামিল তাকিয়ে আছে তমালের দিকে। মাথা ভর্তি চুল তার, তবে গোছানো। বেশ ফর্সা হওয়ার কারণে এর খোঁচা দাড়িগুলো দেখে মনে হচ্ছে এটাও এক ধরনের নক্ষত্র। রাতের অন্ধকার আকাশে যেমন তারা ফুটে থাকে এর মুখে দাড়িগুলোও সেরকম ফুটে আছে। মুখটা লম্বাটেও না আবার গোলাকারও না, দেখে মায়া লাগে এমন। তমালের প্রেমে ধীরা এমনি এমনি পরেনি। এই ছেলে যেমন দেখতে সুন্দর, তার চেয়েও বেশি সুন্দর তার বিনয়। তবে তমালের চোখ দেখা যাচ্ছে না। মাথা নিচু করে বসে আছে তমাল। তার বসার ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে সে এখানে বসে স্বস্তি পাচ্ছে না। কোন একটা জড়তা তাকে আরাম দিচ্ছে না। এই ছেলে ফরমাল পোশাক পড়েছে। তবে শার্টের কালার হালকা গোলাপি। ছেলেদের ক্ষেত্রে গোলাপি রঙটা জামিলের পছন্দ না। তার ধারণা গোলাপি মেয়েদের রঙ। ছেলেদের গোলাপি রঙে মানায়না তবে এই ছেলেকে মানিয়ে গেছে। ব্যাপারটা কি? জামিল মনে মনে বলছে, ছেলেদের অতি সুন্দর হতে নেই।
রেবেকা মীর্জা বাসায় ছিলেন না। মাত্রই এসে পৌঁছালেন। এসেই তমাল কে বসা অবস্থায় দেখে কপালে ভাজ ফেলে বললেন, কি হচ্ছে এখানে? অতি সুন্দর মুখে যখন কোনো কারনে অহংকার জনিত বিরক্তির ছায়া পরে তখন বেশিরভাগ সময়ে সে মানুষটাকে কুৎসিত দেখতে লাগে। রেবেকাকে এখন দেখতে ঠিক তেমন লাগছে।
রেবেকা মীর্জার কন্ঠ শুনে তমাল উঠে দাঁড়িয়েছে। সে দাঁড়িয়েছে ঠিক আসামিদের মত। আসামিদের হাত বাধার পরে যেমন দেখতে লাগে সেভাবে।পার্থক্য শুধু এইটুকুই আসামিদের মাথা থাকে নিচু, আর এই ছেলের উঁচু।
তমালকে বসিয়ে রেখে পাশের রুমে ডেকে নেয়া হয়েছে জামিলকে। জামিলের সামনে চশমা পরা যে মেয়েটি সেই স্নিগ্ধা, সাথে রেবেকা মীর্জা। অনেকটা পেছনে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে যে মেয়েটা জানালা দিয়ে আকাশের দিকে উদাস ভাবে তাকিয়ে আছে সে-ই খুব সম্ভবত ধীরা। তার মুখ চুলে ঢাকা,সে নিজেকে সরিয়ে রেখেছে।
- ওই নেশাখোরটা এখানে কেন? প্রশ্ন রেবেকার!
জামিল তাকালো স্নিগ্ধার দিকে। মায়ের এই প্রশ্ন সে শুনতে পেয়েছে। মেয়েটা এমন প্রশ্ন শুনে লজ্জা পেয়েছে?? হয়তো পেয়েছে। সরল মুখ তার। চুল ছোট, বেশি ছোটও না। ডিপ ব্রাউন কালার চুলে সে করেছে। তার চেহারার সাথে এই কালারটা মানিয়ে গেছে। দেখতে ভালো লাগছে। জামিল খেয়াল করে দেখেছে কিছু কিছু মেয়ের সৌন্দর্য চশমা পরলে আরো বেড়ে যায়। স্নিগ্ধার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। দেখতে ভালো লাগছে।
- ম্যাডাম আমি জানি আমাকে এখানে কেন ডাকা হয়েছে। আমি শুধু এটুকু আপনাকে বলব, আপনি যে আস্থা আমার ওপরে রেখেছিলেন তা আমার কাছে দায়িত্ব। আমার ওপর আস্থা রাখুন। আমাকে কিছুতে বাধা দেবেন না। যেহেতু ডেকেছেন আপনার উচিত আমার উপরে ভরসা করা।
জামিলের কথা শুনে রেবেকা আবার চোখে মুখে ভাঁজ ফেলেছে তবে এখন তাকে দেখতে মন্দ লাগছে না, ভালো লাগছে। কপালে ভাঁজ ফেলারও আলাদা আলাদা অর্থ হয়।
জামিল তার ঘাড় বাঁকা করে ধীরাকে বলল, ধীরা শুনতে পাচ্ছ?
ধীরা তাকালো জামিলের দিকে। সে জানে জামিলকে এখানে কেন ডাকা হয়েছে। সে কারনে ধীরার চোখে মুখে জামিলের জন্য ঘৃণা থাকার কথা। ঘৃণা অনুভূতির বিষয়, বুঝতে পারার বিষয়। ঘৃণা কখনো দেখতে পাওয়া যায় না, ঘৃণাকে কখনো ছুঁয়ে দেখা যায় না। জামিল ধীরার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল তার চোখে এক চিলতে পরিমাণও ঘৃনা নেই। কেন নেই? জামিল গভীর স্নেহ নিয়ে ধীরার চোখের দিকে তাকালো, এই মেয়ের চোখে এত মায়া কেন?
- ধীরা তুমি কি আমাদের দুজনকে দুকাপ কফি দিয়ে যাবে? আমার ধারনা তুমি কফি ভালো বানাতে পারো।
ধীরা কেমন পরাস্ত কন্ঠে জবাব দিলো, দিচ্ছি।
জামিল ঘুরে তাকিয়ে দেখলো রেবেকা ও স্নিগ্ধার দুজনেই কপালেই কেমন অদ্ভুত ভাঁজ ফেলেছে। রেবেকার কপালের ভাজের কারণ স্পষ্ট। স্নিগ্ধারটার কারণ স্পষ্ট নয়।
জামিল বলল, কি নাম তোমার?
- জি আমার নাম তমাল।
এই প্রথম জামিল তমালের চোখ দেখতে পেলো। এ ছেলের চোখ লাল। তবে সেটা নেশা করার জন্য নয়। জামিল বুঝতে পারছে এ চোখ লাল হবার একটাই কারন হতে পারে। এ ছেলে কিছুদিন হলো ঠিক ভাবে ঘুমাচ্ছে না। জামিলের বিশ্বাস তমাল নেশাখোর না। কিন্তু রেবেকা তমালকে নেশাখোর কেন বলবে? এ ছেলেকে অপছন্দ করবার কারণ কি হতে পারে? রেবেকার ভয়টা আসলে কিসে? তমালকে অপছন্দের কারণটা তার একান্তই ব্যক্তিগত। ধীরা যদিও অন্যায় করেছে কিন্তু তবুও চমৎকার একটি ছেলেকে বিয়ে করেছে সে।
- এখানে কেন এসেছো জানতে পারি?
তমাল মুখ তুলে তাকালো জামিলের দিকে। ছোট্ট ছোট্ট স্বরে বলল, আমার একটা চাকরি হয়েছে কাল থেকেই কাজে জয়েন করব সেটা ধীরাকে বলতে এসেছিলাম।
- তোমাকে এখানে কেউ সহজ ভাবে নিচ্ছে না এটা কি তুমি বুঝতে পেরেছ???
- জি আমি বুঝতে পেরেছি।
- ধীরাকে কেমন ভালোবাসো তুমি?
- আমি বলতেই পারি অনেক ভালোবাসি । তবে এই প্রশ্নের জবাব আপনার ধীরার থেকে নেয়া উচিত কারণ একমাত্র সে'ই বলতে পারবে আমি তাকে কেমন ভালোবাসি।
- তুমি কি জানো ধীরা তোমাকে ডিভোর্স দেয়ার বিষয়ে রাজি হয়েছে?
তমাল তাকালো জামিলের দিকে। তার চোখ ছল ছল করছে। যেকোনো সময়ে সেটা গড়িয়ে নিচে পড়তে পারে। তমাল আবার চোখ নামালো।
জামিল বলল, তমাল তাকাও আমার দিকে। আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনবে।
তমাল তাকাতেই জামিল বলতে শুরু করলো। তমাল যে মেয়েটি তোমাকে সত্যিই ছেড়ে যেতে চায় তার মানে এই, তার মনের ভেতরে কোথাও তুমি আর নেই। ধরো এই কথা ধীরা তোমাকে বলছে এটা তুমি মেনে নিতে পারবে?
তামাল ভেজা ভেজা কন্ঠে জবাব দিল - না,ধীরার মুখে একথা শোনার আগে মরন উত্তম।
- তুমি চাইলে তাকে ডেকে তাকে প্রশ্ন করতে পারো। কিন্তু সে যে অবস্থায় আছে আমি যে কথাটা তোমাকে জানিয়েছি ধীরা তাই বলবে। যেটা শুনলে তুমি আরো বেশি কষ্ট পাবে। ধীরা নিজেও কষ্ট পাবে। আমার ধারনা তুমি এই কষ্টটা ধীরাকে দিতে চাচ্ছো না । আমার ধারনা কি ঠিক???
- হা আমি তাকে কষ্ট দিতে চাইনা।
জামিল উঠে গিয়ে তমালের পাশে বসলো। কাঁধে হাত রেখে বলল, একজন প্রেমিকের কাছে দুনিয়ার সব চাইতে কষ্টের বিষয় হচ্ছে তার প্রেমিকা যদি তাকে বলে, আমি আর তোমাকে চাইনা। এর থেকে কষ্টের কিছু আর হতে পারেনা একজন প্রেমিকের জন্য। এতে করে কোনো এক সময়ে তোমার মনে হতে পারে,সে আমাকে কখনো ভালবাসেনি। এই কথা তোমার অন্তরে জন্ম নিলে এতে তাকে অপমান করা হয়।
তমাল শোনো, একজন স্বামীর কাছে তার স্ত্রীর থেকে ডিভোর্স মেনে নেওয়া সম্ভব, কিন্তু আমি তোমাকে আর ভালোবাসিনা একথা তার মুখ থেকে শোনা বা মেনে নেয়া অসম্ভব।
তমাল জামিলের কাধের উপর রাখা হাতে হাত রেখে বলল,আপনি ঠিক বলেছেন।
তমাল শোনো, আমার একটা পরামর্শ আছে তুমি কি শুনবে? তমাল তার ভাঙ্গা কন্ঠে বলল,হা আমি শুনতে চাই।
তমাল আমার একটাই পরামর্শ তোমাকে দেবার আছে, তা হচ্ছে, "তমাল আমি আর তোমাকে চাইনা,আমি তোমাকে আর ভালোবাসিনা" এই কথা বলার সুজোগ তুমি ধীরাকে দিবেনা। তোমাকে আর ভালোবাসিনা এ কথা তাকে বলার সুযোগ না দিয়ে ধীরা তোমারই আছে এটা ভেবে থাকাটাই কি ভালো না??? ভালোবাসিনা এটা বলতে দিলেই তো সব শেষ। বলেনি মানেই সে এখনো তোমার, এই আশা নিয়ে প্রেমিকরা একটা জীবন ভালো ভাবেই কাটিয়ে দিতে পারে।
- তমাল বলল,আপনি ঠিক বলেছেন।
জামিলের কাজ শেষ হয়নি। সে আবার বলল,আমি তোমাকে আরো একটি পরামর্শ দিতে চাচ্ছি তুমি গ্রহণ করবে???
তমাল আগের চে শান্ত গলায় বলল,হা বলুন।
জামিল বলল, যে পরিবার তোমাকে মেনে নেয় নি, তোমাকে লোফার ভেবেছে সেই পরিবার কে তুমি ভুল প্রমাণিত করে দাও।
তমাল জামিলের দিকে তাকালো। তাকিয়ে আগ্রহের স্বরে বলল বুঝিয়ে বলুন,আমি শুনছি।
জামিল বলল, এই পরিবার ভেবে নিয়েছে এই ছেলে নেশাখোর, নির্লজ্জের মত রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে। এই ছেলের সামাজিক কোনো স্বীকৃতি নেই। তো তুমি যদি তাই আবার করো বা তোমার সমাজে যদি তুমি সামাজিক স্বীকৃতি না পাও তাহলে তাদের ধারনা সত্যি বলে প্রমাণিত হয়। তোমার দিকে আঙ্গুল তুলে ধীরাকে বলবে,দেখেছিস আমরা বলেছিলাম না এই ছেলে এমন। দেখলি আমাদের কথা সত্যি হলো। এতেই তোমার পরাজয়। আমার একটাই অনুরোধ তুমি এদের ধারণা ভুল প্রমাণিত করবে।
তমাল জামিলের দিকে তাকিয়ে বলল,আমি বুঝেছি। আপনাকে কথা দিলাম আমি তাদের ধারনাকে ভূল প্রমাণিত করবো।
জামিল তার কন্ঠে মায়া নিয়ে বলল, তুমি সেটা করতে পারবে এটা আমি জানি।
তমাল বলল,আমি চলে যাচ্ছি এখন।
জামিল বলল, তোমার চাকরির কথা ধীরাকে জানাবেনা,??
তমাল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, না।
- ধীরা কফি নিয়ে আসবে। এসে তোমাকে না পেলে কষ্ট পাবে। শেষবারের মত তার হাতের কফিটা তোমার নেয়া দরকার।
কফি হাতে নিয়ে ধীরা রুমে প্রবেশ করতেই জামিল দেখলো ধীরাকে দেখতে এমন কেমন আলাদা আলাদা লাগছে। ধীরা তার হাতে নেইল পলিস করেছে। কিছুক্ষণ আগেও এটা তার হাতে ছিল না। খুব সম্ভবত এটা তমাল পছন্দ করে৷ তমাল কি এটা বুঝবে?? দেখবে??? বোঝা উচিত, দেখা উচিত। সত্যিকারের প্রেমিকদের এসব চোখ এড়ায় না। জামিল দেয়ালের উলটো দিকের ঘড়ি দেখার ভান করে পেছনে তাকালো। দুজন শেষ বারের মত অন্তত নিজেদের মত করে নিজেদের দেখুক। হতেও তো পারে এটাই তাদের শেষ দেখা।
তমাল এখন চলে যাবে। জামিলকে বুকে জড়িয়ে ধরল তমাল আর বলল, ধীরাকে শেষ বারের মত দেখবার সুযোগ করে দেয়ার জন্য আপনার কাছে কৃতজ্ঞ রইলাম।
এই একটু দেখা একজন প্রেমিকের কাছে অনেক কিছু। প্রেমিকাকে এক পলক দেখে একজন প্রেমিক সহস্র কোটি বছর পার করে দিতে পারে। জামিল দেখছে তমাল চলে যাচ্ছে। একবারও পেছন ঘুরে সে দেখছে না। জামিলের কেন জানি মনে হচ্ছে, তাদের আবার দেখা হবে। রেবেকা মীর্জাকে জামিল যেটুকু বুঝেছে তাতে রেবেকা একজন পাকা জহুরি। পাকা জহুরি হয়ে খাঁটি সোনা চিনবেনা?? এটা কি করে হয়??
এখন তারা তিন জন বসে আছে। রেবেকাকে কেমন জানি একটু উদাসীন লাগছে। স্নিগ্ধাকেও তাই। কেউ কিছু বলছেনা। নীরবতা ভেঙে জামিল বলল, আমার কাজ শেষ হয়েছে। আমি কি এখন যেতে পারি?
রেবেকা বলল,আপনি শিউর সে আর আসবেনা?
জামিল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, এটা আমার বিশ্বাস। আমার বিশ্বাস এটা যে, তমালকে নিয়ে আর ভয় পেতে হবেনা। আপনার সম্মান তাকে দিয়ে নষ্ট হবেনা। যে ছেলে তার স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা এবং আপনাদের প্রতি সন্মান দেখাতে গিয়ে একটি বারের জন্যও তার অধিকারের প্রশ্ন তোলেনি সে ছেলের আত্মসম্মান আপনাদের চেয়ে বেশি হবার কথা। এই কথা শোনার পরে রেবেকার রেগে যাবার কথা। কিন্তু উনি তা করলেন না। জামিল না থেমে বললেন, আপনারা এখন খুশি মনে ডিভোর্স সেরে ফেলতে পারেন। এ কথার পর স্নিগ্ধা জামিলের দিকে তাকিয়ে ভাবছে, এই লোক এত কঠিন কথা এত সহজে কি করে বলতে পারে? কি করে?
রেবেকা মির্জা উঠে চলে গেছে তার রুমে। বসে আছে জামিল আর স্নিগ্ধা। ধীরাকে দেখা যাচ্ছেনা। সে হয়তো চুপচাপ আকাশ দেখছে। কিছু কিছু অশ্রু থাকে যেগুলো চোখ ভেজায় না, দেখাও যায়না। এ মেয়েটা হয়তো মাকে প্রচন্ড ভালোবাসে। তার মাকে সে কারো কাছে ছোট হতে দেবেনা। তার মায়ের ইচ্ছে পূরণ হচ্ছে এতেও হয়তো তার সুখ, এই সুখই বা কম কি?
ধীরাকে ডেকে জামিলের বলতে ইচ্ছে করছে, ধীরা আমার ধারনা তুমি মায়ের সাথে কখনোই জিততে পারবে না।
স্নিগ্ধা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জামিলকে বললো, কি বললেন তাকে??
জামিল মুচকি হেসে বলল, এই বসার রুমে আপনাদের ক্যামেরাটা খুব একটা ছোট না। পাশের রুম থেকে সব দেখা জায়, শুনতে পাওয়াও যায়। তবে ধীরা সেটা দেখবেনা,শুনবেনা আমার তাই মনে হয়। তবে আপনার সব দেখেছেন,সব শুনেছেন।
অবাক চোখে স্নিগ্ধা তাকিয়ে আছে জামিলের দিকে। জামিল বলল,আমাকে যেতে হবে।
স্নিগ্ধা বলল, আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে চাই। তবে প্লিজ মন খারাপ করবেন না। আমি জানি আপনার মন খারাপ হবে। তবুও জানতে ইচ্ছে করছে।
জামিল বলল, হা বলো কি জানতে চাও?
স্নিগ্ধা তার কন্ঠে কিজানি কি দরদ এনে বলল, আমি তোমাকে আর ভালোবাসিনা এই কথা আপনার প্রাক্তন কি আপনাকে কখনো বলেছিল?
জামিল কষ্ট আড়াল করে হাসি মুখে বলল,স্নিগ্ধা তুমি ভালো করেই জানো এই প্রশ্নের জবাব তুমি পাবেনা।
স্নিগ্ধা মাথা নাড়লো। জামিল চলে যাচ্ছে, হঠাৎ দাড়িয়ে বলল, তোমাকে একটা প্রশ্ন করতে পারি???
স্নিগ্ধা খুব কৌতূহলের সাথে বলল, জি করুন।
জামিল তার কপাল ভাজ করে বলল,
তুমি স্নিগ্ধা মীর্জা নাকি স্নিগ্ধা রহমান?
প্রশ্ন শুনে স্নিগ্ধার মন খারাপ হলো। সে জবাব দিল, আমি স্নিগ্ধা, শুধুই স্নিগ্ধা।
( - চলবে......)
Click here to claim your Sponsored Listing.
Website
Address
Dhaka
