২০১৫ সালের জানুয়ারির কথা বলছি। পারফিউমেন্স তখন টগবগে তরুণ একটি প্রতিষ্ঠান। পেইজে লাইক সংখ্যা ১৫০০ছাড়িয়েছে বোধহয়। আর ১০-১২দিন পর ঢাকা ইউনিভার্সিটির চত্বর মুখোরিত হবে নতুন শিক্ষার্থীদের পদচারণায়, অধম আতরচি-ও কিভাবে কিভাবে যেনো একেবারে তার কাজের সাব্জেক্ট এ ই ( কেমিস্ট্রি) চান্স পেয়ে গিয়েছিলো! জানুয়ারির শুরুর দিকে, হঠাৎ করেই একদিন নক করলেন এক ভাইয়া। শুরুতেই অর্ডার দিয়ে ফেললেন ১৫টার বেশি পারফিউম!
তখনো পারফিউমেন্সের প্যাকেট কমপ্লিট হয়ে উঠেনি, তাই নরম্যালি ই যথেষ্ট প্রটেকশান দিয়ে প্যাক করে ফেলা হলো। কোথায় ডেলিভারি, জিজ্ঞাসা করতেই ভাইয়া এমন এক জায়গার কথা বললেন, যেটা ঢাকা ইউনিভার্সিটি’র একদম কাছে। জানি না কি হলো, ভাইয়া-টাকে রিপ্লাই দিলাম, কুরিয়ার নয় আমি নিজেই আসতেছি ইনশাআল্লাহ্!
ঘরকুনো আতরচি’র প্রথম স্বহস্তে ডেলিভারি! রাস্তাঘাট সত্যিসত্যি কিছু চিনি না। অগত্যা বড়ভাইকে সাথে নিয়েই যেতে হলো ভাইয়া-টার সাথে দেখা করতে! অনেক ফোনকল, অনেক অলিগলি পেরুনো’র পরে দেখা পেলাম এবং আক্ষরিক অর্থেই ভিমড়ি খেলাম :0
ভাইয়ার প্রোপিকে এইটুকু দাড়ি, অথচ সামনাসামনি এত্তবড় দাড়ি ! কি যে ভাল্লাগলো বলে বুঝানো যাবে না ^_^ [ পরে বুঝেছি, ছবি-টা বহু বহু বহুউউউ বছর আগেকার ]। শুরুতেই বেশ আপন করে নিলেন, তিনিও বেশ বিস্মিত হয়েছিলেন বোধহয় আতরচি’র ডেলিভারি দিতে চলে আসায় আপ্যায়ন না করিয়ে ছাড়লেন ই না
মাহিদুল ইসলাম ভাইয়ের সাথে পরিচয় এভাবেই। এরপরে হঠাৎ আরেকদিন, ভাইয়া’র ফোন, আতরচি চলে এসো! কথা গুরুত্বপূর্ণ!!…. এবার অনেক কিছুই চিনি রাস্তাঘাট, একলা যাবার পালা লেক এর পাড়ে বসেই বোধহয় ভাইয়া-টা জানালেন প্রথম, ” তুমি যেহেতু লিক্যুইড নিয়ে কাজ করছো, কেমেস্ট্রি নিয়ে পড়াশুনা, পারফিউমের পরে অন্যকিছু’র চিন্তা আছে কি? ” অবাক জিজ্ঞাসা, “কিরকম চিন্তা”?
ভাইয়া’র জবাব, ” বিদেশে একটা জিনিসের অনেক প্রচলন, কিন্তু আফসোস, বাংলাদেশে এটা তৈরি’র মত এখনো কেউ নেই, হয়তো জানেও না এর সম্পর্কে! কিন্তু এর গুণাগুণ বলে শেষ করা যাবে না… ”
মন্ত্রমুগ্ধের মত গিলতে লাগলাম ভাইয়া’র কথাগুলো…..
সেদিন বাসায় ফিরেছিলাম ঘোরলাগা চোখে। এত জোস একটা জিনিস এতদিন চোখের আড়াল রয়ে গেছিলো!! যেই দাড়ির রক্ষণাবেক্ষণে এত সময় লেগে যায়, সেটার পুষ্টি নিশ্চিত করতে সত্যিই যে কিছু করা হয় নি।
ভার্সিটি’র পড়া ফালায়ে বসতে হলো অরগানিক ক্যামেস্ট্রির একটি বিশেষ অংশ ‘এসেনশিয়াল অয়েল” নিয়ে। বিভিন্ন উপকারী উদ্ভিদ/ফল/পাতা/ফুলকে এক বিশেষ পদ্ধতি ( সাধারণত কোল্ড প্রেসড পদ্ধতিতে) তে নিংড়ে রসটুকু বা উপকারী তরলটুকু বের করে আনা’র মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটে এর উৎপাদন প্রক্রিয়া, এরপরে শুধু ব্যবহারের অপেক্ষা! আয়ুর্বেদ বলতে আমরা যা বুঝি,সেটার সাথে তুলনায় এসেনশিয়াল অয়েল হচ্ছে “ডিজিটাল চিকিৎসা প্রণালী” যেখানে গাছগাছালি’র উপাদানকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন উপকার সাধন করা হয় কোন ক্যামিকেল/এন্টিবায়োটিক এর সাহায্য ছাড়াই।
খানিকটা অফটপিকে একটা সত্য গল্প বলি, অকা? ইতিহাসের বই ঘাটলে ১৪শ শতকের ইউরোপ-এশিয়া জুড়ে মহামারী প্লেগের কথা জানতে পারা যাবে বেশ ভালো করেই। লাখে লাখে মানুষকে বরণ করে নিতে হয়েছে “কালো মৃত্য”। সেই সময়ে প্রাকৃতিক চিকিৎসা হিসেবে ক্লোভ, সাইপ্রেস, সিডার, পাইন, সেইজ, রোজমেরি ও থাইম — এসেনশিয়াল অয়েল পাওয়া যায় যে গাছগুলা থেকে, সেগুলা পুড়ানো হয়েছিল বেশ কিছু রাস্তা, হাসপাতাল, রোগির রুমে। এবং হ্যা, এ কাজে নিয়োজিত আতরচি’গণ এবং যেসব রোগি দৈনিক এর সংস্পর্শে এসেছিলেন , আল্লাহর রহমতে তারা সেরে উঠেছিলেন প্লেগ রোগ থেকে :)
গল্প আর কঠিন সব শব্দের কচকচানি বাদ দিই বরং। আসল কথা হচ্ছে, বেশ কিছু এসেনশিয়াল অয়েল চুল ও দাড়ির জন্য উপকারী, তাদের সীমিত পরিমাণে সতর্কতার সাথে এক করতে পারলে বাজিমাত হবে ইনশাআল্লাহ্ (আপডেট: বাজিমাত হচ্ছে!) । এই কাজে, খোলা মনেই বলি, আমি অভিজ্ঞ নই। কেননা, এসেনশিয়াল অয়েল মার্কেট-টা বেশ ভেজালের আখড়া, দক্ষ কেউ না থাকলে পা হরকানো’র চান্স খুব বেশি ( এসেনশিয়াল অয়েল বাংলাদেশে পাওয়া যায় না। প্রতিটায় বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। দামের ব্যাপার-টা না ই বলি। এই যেমন, ২০টা গোলাপ থেকে কোল্ড প্রেস করে বের করে কয়েক ফোটা অয়েল! তাই দাম আকাশ্চুম্বি না হলেও বুর্জে খলিফা সমান উচু ত বটেই!!)। তাই চাচ্ছিলাম কোন এক্সপার্ট এর সাথে কথা বলতে। কিন্তু এমন মানুষ পাই কোথা?
আল্লাহ সুবহানাল্লাহু তায়ালা যেন রাহমাহ-স্বরুপ পাঠিয়ে দিলেন তার এক বান্দাকে। ঘটনা-টা ছোট্ট করে বলি। হঠাত করেই কালেকশানে সাময়িকভাবে এসেছিলো ১০০মিলি’র মত “এম্বারজিস”, ঘন সাদাটে ক্রিমের ন্যায় পারফিউম ; যার সাথে পুরোপুরি মিল ছিলো আতর জগতের সবচে ফেমাস ব্র্যান্ড “আব্দুস সামাদ আল কুরেসি” এর ‘বডি মাস্ক’ এর সাথে! এই খবর ছড়িয়ে পড়লো অল্প সময়েই ; এক ছাত্রের মাধ্যমে জানতে পারলেন বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। ফোন দিলেন আতরচি-কে।
এ সম্পর্কে হালকা ইনফো নিয়ে, তিনি অর্ডার দিলেন, এড্রেস জেনে দেখি আমার বাসা থেকে ৫মিনিটের দূরত্ব। বললাম, চলে আসুন তবে ; তিনি রাত সাড়ে ৯টায় চলে এলেন!! হতচকিয়ে গেলাম, উরি বাব্বা, ইনি দেখি পুরাই সৌদি!!
নাহ, লম্বা-চওড়া, জুব্বা আর পাকোল পরা ভাই-টা সৌদি নন, তবে জন্ম তাহার কুয়েতে! তবে আগাগোড়া বাঙালি আর কি। নানান কথাবার্তার পরে, কি এক প্রসংগে ভাইয়া বলিয়া উঠিলেন, ছোট্টবেলা থেকে ওউধ-মাস্ক-আম্বার আর এসেনশিয়াল অয়েল নিয়ে বেশ নাড়াচাড়া তাহার, বিদেশে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়ার সময়ে এই ব্যাপারে আরো অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন :-০ :-০
….. পরের দুইটা মাস, ভাইয়া’র সাথে একসাথে মিলে নেমে পড়েছিলাম গবেষণায়! খান ভাই ক্লাস শেষ করে চলে আসতেন, নিজ বাসায় ফিরে যেতেন রাত ১টা কি মাঝে মাঝে ২টার-ও পরে! দীর্ঘ ২মাসের খাটাখাটির পরে ফাইন্যাল হয়েছিল ফর্মুলা, যেটা অটুট রাখবে দাড়ি আর দাড়িসংলগ্ন ত্বকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সেই সাথে অনুভুতি দিবে আনকোরা নতুন ভিন্ন রকমের নমনীয়তা’র! মোট ১৬রকমের “এসেনশিয়াল অয়েল” আর ৬ধরণের “ক্যারিয়ার অয়েল” সিলেক্ট করা হলো ৫রকম বিয়ারড অয়েলের জন্য [ টার্মগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবেন এইখানে ]
কোন কাজ সফল হলে অনেক খুশি লাগে। আর বেসম্ভব পরিশ্রম আর কষ্টের পরে কোন কাজে ফল পাওয়া গেলে খুশির মাত্রা বেড়ে হয়ে যায় লক্ষ-কোটি গুণ :)