Inspired Life By Deen

Inspired Life By Deen

Share

Contact information, map and directions, contact form, opening hours, services, ratings, photos, videos and announcements from Inspired Life By Deen, Health/Beauty, Moulovibazar Polli Biddut Samity, Sreemongol, Moulovibazar, Maulvi Bazar.

21/08/2023

অশ্রুভেজা ডায়েরি

জানুয়ারী ১৯৯১

রাত ৰাজে আড়াইটা। মেঝেতে খানিকক্ষণ এপাশ ওপাশ করে ক্ষান্ত দিলাম। ঘুম আর আসবেই না। চোখটা লেখে এসেছিল একবার। শুনতে পেলাম বিছানা থেকে মা কোঁকাচ্ছেন, 'শিউলি... ও শিউলি....

আমি উঠতে-না-উঠতেই বিছানা ভাসিয়ে ফেললেন মা। তাকে পরিষ্কার করালাম, বিছানা পরিষ্কার করলাম। চাদর, কাঁথা সব ধুয়ে দিলাম যাতে সকালের মধ্যেই শুকিয়ে যায়। যত দ্রুত সম্ভব বিছিয়ে দিতে হবে। মা আমার খালি তোশকে রাত কাটাচ্ছেন। এই রাতের বেলা চাদরের জন্য ভাইয়া-ভাবির ঘুম ভাঙানো যাবে না। প্রায়ই এমন হয়। একটাই সান্ত্বনা, এই শীতের রাতেও দরদর করে ঘামেন আমার

মা। লেপ-কম্বল লাগে না। কখনও-সখনও কাঁথা গায়ে দেন, আবার আমাকে

ডাকেন কাঁথাটা সরিয়ে দিতে।

আমি কাঁথা সরিয়ে দিই। ঘামে ভেজা মাকে ভালপাখা নিয়ে বাতাস করি। মাঝে মাঝে অতি সাহস করে ফ্যান ছেড়ে দিই। শীতে কষ্ট পাবার ভয় আমার নেই। ভয়টা ভাই-ভাবিকে নিয়ে। এক রাতে ফ্যান ছেড়েছিলাম বলে কী তুলকালাম! পুরাতন ফ্যানের ঘটঘট

আওয়াজ

শুনে ভাই দৌড়ে এলো।
'এই শীতের রাতে ফ্যান কেন? বিস্তৃত বিল বাড়াতে চান? ভাইয়ের স

খেয়ে-পরেও পোষাচ্ছে না?

বদ্ধ পুকুরের শান্ত পানির চেয়েও শান্ত গলায় বলেছিলাম, 'তোমারটা খাচ্ছি না। বাবা যে সম্পত্তি রেখে গেছেন তাতে আমার খাওয়া-পরার খরচ উঠে আরও থেকে যাবে। আমি আর কতটুকুই খাই, কতটুকুই বা পরি? দুই ঈদে একটা করে আনা পাই, তাও মামার কাছ থেকে। তোমার থেকে কিছুই নিচ্ছি না। নিশ্চিন্তে ঘুমাতে যাও।'

ততক্ষণে ভাবিও এসে হাজির। চুপ থাকলেই পারতাম। মুখে মুখে তর্কের অপরাধে জল অনেক দূর গড়ালো। সে-রাতে কেউ ঘুমায়নি। বাড়ির বহু পুরোনো ইতিহাन, কার কত অবদান, কে বসে খায় আর কে ঘাম ঝরার ইত্যাদি তর্কে রাত পেরিয়ে ভোর। তর্কে জিতল ভাই আর ভাবি। আমার শোচনীয় পরাজয়। প্রমাণিত হয়ে গেছে, এ সংসারে আমি শুয়ে বসে কেবল অন্ন ধ্বংস করে যাচ্ছি। সেইসাথে পিতৃসম বড়ভাইয়ের মুখে মুখে তর্ক করে তার প্রতিদান দিচ্ছি। দুনিয়ায় যাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি, সেই মা-ও কথা বললেন না পাক্কা দুই দিন।

এরপর থেকে উচিত কথা গিলে ফেলতে শিখেছি। চুপচাপ শুনে যাই। যে যা বলে মেনে নিই। তালপাখা নাড়াতে নাড়াতে হাতটা অবশ হয়ে আসলে সাহস করে ঘটঘটে ফ্যানটা একটুখানি ছেড়ে দিই। আমার সাহসের দৌড় অতটুকুই।

মনকে মানিয়ে নিয়েছি। বাবার রেখে যাওয়া বাড়িতে যে খেয়ে পরে বেঁচে থাকতে

পারছি সে-ই ঢের। পশ্চিমের আলো বাতাসহীন ঘরটা আমাদের। আমার আর

মায়ের। আমরা দুজন এ ঘরেই সংসার পেতেছি।

দরজার ওপারে আলাদা একটা জগত। আলাদা সংসার। সেখানে ভাই, ভাবি আর আমার আদরের ভাতিজি তুলতুলির বসবাস। সে সংসারেও আমার একটা অবস্থান আছে বটে! আমি সেখানকার বেতনবিহীন কাজের বুয়া। সারাটা দিন দৌড়ে কাটে আমার। তুলতুলি এক পেরিয়ে দুইয়ে পা রাখল। দিনের অনেকটা সময় তাকে দেখে রাখতে হয়।

ভাবির মাস্টার্স প্রায় শেষের পথে। এরপর চাকরিতে ঢুকে যাবে। তার ছোট চাচা আগে থেকেই ব্যবস্থা করে রেখেছেন। মাস্টার্সটা শেষ করলেই জয়েনিং। সে সময় তুলতুলিকে হয়তো সারাদিন দেখে রাখতে হবে। কাকে ছেড়ে কাকে দেখব? মাকে, নাকি তুলতুলিকে!
অগাস্ট ১৯৯১

বহুদিন পর একটু অবসর পেলাম। তুলতুলিকে নিয়ে ভাবি গেছে বাপের বাড়ি। আয় বিকেলেই গেল। যাবার আগে মায়ের সাথে বেশ গল্প করল দেখলাম। আমি আশ ব্যস্ত ছিলাম তুলতুলিকে গোসল করাতে।

গোসল শেষে রান্নাঘরে ঢুকে গেলাম। মনটা বেশ উড়ুউঁচু। এতদিনের স্বপ্ন পূরণের বার্তা পেয়েই হয়তো। বাবা মারা যাবার পর আমার বিয়ের সম্বন্ধ আসে না বললেই চলে। বেঁচে থাকতে একের পর এক সম্বন্ধ আসত। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার। তখন মাত্র ইন্টার পরীক্ষা দিয়েছি। একে একে সব প্রস্তাব নাকচ করে দিতেন বাবা। পড়াশোনা শেষ করে প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত বিয়ে দিতে চান না তিনি।

ফুফুদের দেখেছেন সংসারে একটা পরিচয়ের অভাবে, ডিগ্রির অভাবে মানবেতর জীবন-যাপন করতে। ভাই হিসেবে চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার ছিল না তার। মেয়েকেও সেই একই জীবনের দিকে ঠেলে দিতে চাননি।

যে-সমাজের মানদণ্ড এত নীচ; যে-সমাজ ডিগ্রি থাকলেই, চাকরি থাকলেই মাথায় তুলে রাখে, নতুবা নয়; সে-সমাজকে কেন যেন আমরা শুধরে যেতে বলি না। উল্টো সমাজের মানদণ্ডে উত্তরে যেতে নিজেকেই কারাদণ্ড দিয়ে বসি।

ডিগ্রি নিতে আমার অনিচ্ছা ছিল না, আপত্তিও ছিল না। ওদিকে জীবনসঙ্গীর অভাবটাও তাড়িয়ে বেড়াত। ওই যে বললাম—সমাজের কথা, যা সুচতুরভাবে ডিগ্রি আর বিয়ের মাঝে সংঘাত ঘটিয়ে দিয়েছে। হয় ডিগ্রি, নয়তো বিয়ে।

বাবা মারা যাবার পর মা পড়ে গেলেন বিছানায়। বাবার স্বপ্ন পূরণ হলো না আর। আমি পড়াশোনা বাদ দিয়ে ঘরে রয়ে গেলাম মায়ের দেখাশোনা করতে। অসুস্থ মায়ের যতক্ষণ হুশ আছে ততক্ষণ আমার জন্য আক্ষেপ। কেন যে সম্বন্ধগুলো বাতিল করে দিয়েছিলেন বাবা! আমার ভবিষ্যৎ চিন্তায় চোখে অন্ধকার দেখেন মা। ভয় পান, তার কথা ভেবে না-জানি আজীবন কুমারী থেকে যাই।

"মা রে, তুই আমার জন্য চিন্তা করিস না। আল্লাহ আছেন। তিনিই ব্যবস্থা করে দেবেন। প্রতিদিন সকাল-বিকাল একই কথা ওপেন। একজন সঙ্গীর অভাবে আমারও প্রাণ কাঁদে। মায়ের চিন্তারও ঘুম আসে না। আমি চলে গেলে ভাই-ভাবি কি মাকে দেখবে? কত রকমের স্বপ্ন দেখি। বিয়ের পর স্বামীকে বলে মায়ের জন্য একটা নার্স রেখে দেব। জটিল সব টানাপোড়েনে দিন কাটে। সমস্যার শেষ নেই, সমাধান

গতকাল বিকেলে সোহেলী আপা এলো বাড়িতে। আমার জন্য সম্বন্ধ এনেছেন। পাত্রপক্ষের সবদিকই আমাদের পরিবারের সাথে মিলে যায়। আপত্তি করবার জায়গা নেই। এতদিন টুকটাক যে ক-টা সম্বন্ধ আসত, ভাই-ভাবি নাকচ করে দিয়েছেন নানান ছুঁতোয়। এটা মেলে, তো সেটা মেলে না। এই পাত্রের বেলায় ভাইয়াও বলে বসল, 'ছেলে তো বেশ ভালোই!”

এরপর বিয়ে নিয়ে কদ্দুর কথা হয়েছে জানি না। আজ দুপুরে ভাবি কি আমার বিয়ে নিয়েই আলাপ করছিল? জানা নেই। রান্নাবান্না সেরে, ঘরদোর গুছিয়ে অবসর পেলাম পড়ন্ত বিকেলে। এক কাপ চা নিয়ে মায়ের মুখোমুখি বসেছি। গতকাল বিয়ের সম্বন্ধ আসার পর থেকেই মায়ের মুখটা ঝলমল করছিল। রুম-ভগ্ন শরীরের সব কষ্ট ছাপিয়ে মেয়ের একটা গতি হচ্ছে সেই আনন্দ দেখেছিলাম তার চোখে-মুখে। অথচ আজ যেন কোথায় কী নেই।

চোখটা কি চিকচিক করছে মায়ের? এগিয়ে এসে হাত দুটো ধরলাম। এই হাতে একা সংসার সামলেছেন একসময়। আর এই হাত এখন কতটা অসহায়।

হাত ধরতেই ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন মা।

“মা রে তুই আমার আদরের মেয়ে! শ্বশুরবাড়িতে তোর কোনো কষ্ট সইতে পারব, বল? এই বিয়েটা করিস না মা।

এক দিনের ব্যবধানে মায়ের আমূল পরিবর্তন। থমকে গেলাম। চোখের সামনে মেয়ের কষ্ট সইতে পারেন যিনি, চোখের আড়ালে শ্বশুরবাড়ির কষ্টে তার এত ভয়!

ফেব্রুয়ারি ১৯৯২

ভাবির ছোট বোন শিল্পীর বিয়ে হলো আমাদের বাড়িতে। ভাবির আবদার। তাদের সেই ভাড়া বাড়িতে বিয়ের আয়োজন সম্ভব না। আমাদের বাবার রেখে যাওয়া বাড়িটা ভাঙাচোরা হলেও নিজের বাড়ি তো বাড়িওয়ালার খবরদারি নেই, যখন তখন নোটিশেরও ভয় নেই।
এই কয়দিন গায়ে হলুদের খাটাখাটনি করে ক্লান্ত-শ্রান্ত আমি। গা এলিয়ে শোবার ফুসরত মেলেনি। ফুল দিয়ে ঘর সাজানো, আলপনা আঁকা; সব নিজ হাতে করেছি। সাথে ছিল তুলতুলি। ফুপির কোল থাকে না। চারিদিকে কী আনন্দ, কী হইচই। সবার চোখে-মুখে খুশির জোয়ার। কেবল আমারই ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল ভীষণ। নাহ, অন্যের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, আমার হচ্ছে না-

এমন ঈর্ষা থেকে নয়। পাত্রের নাম-ধাম জেনে গিয়েছিলাম। সেই থেকে শরীরের।

সাথে সাথে ভারী মনটাকেও টেনে নিয়ে চলছি।

পাত্র সেই ব্যক্তি, যার সম্বন্ধ আমার জন্য এসেছিল, যার ব্যাপারে আমার উন্নাসিক

ভাইও বলেছিল, 'ছেলে তো বেশ ভালোই।' একে একে সব রহস্যের জট খুলে গেল। সম্বন্ধ আসবার পর কেনই বা আমার ব্যস্ত ভাবি মায়ের সাথে এত গল্প জুড়ে দিল? কেনই-বা তড়িঘড়ি করে বাপের বাড়ি

ছুটল! মাকে ভাবি কী বলেছিল—তা জানি না। কেবল ফলাফলটা জানি!

পৃথিবীতে কিছু রহস্যের জট না খুললেই বুঝি ভালো! এক ধাক্কায় সব রহস্য ভেদ হয়ে যাবার ভার সইতে পারলাম না। বিয়েবাড়ির হই হুল্লোড় শেষ হতেই নিস্তেজ হয়ে পড়লাম। কিছুই ভালো লাগে না আর। মায়ের ওপরও ভীষণ রাগ হয়। মাঝে মাঝে। পরক্ষণেই ভাবি--কতটা অসহায় আমার মা! কতটা অসহায়! বিছানায়। পড়ে-থাকা মা আমার! তার ওপর রাগ করে কী লাভ!

নভেম্বর ১৯৯৫

ট্রাংক খুলে কাগজপত্র ঘাঁটছিলাম। হুট করে পেয়ে গেলাম ডায়েরিটা। পেয়েই যখন গেলাম, আবার না হয় লিখি।

মা চলে গেছেন বছরখানেক হলো। যখন তখন 'শিউলি শিউলি বলে কেউ ডাকে না আর। প্রথম প্রথম খুটখাট শব্দেও জেগে যেতাম ঘুম থেকে। মা কি টয়লেটে যাবে? পানি খেতে চায়? ঘুম ঘুম চোখে শূন্য বিছানা দেখে আঁৎকে উঠতাম। মা কই? এখন অবশ্য নতুন জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। ভাবি অফিসে চলে যায়, সন্ধ্যায়

ফেরে। ভাইও তাই। এত বড় বাড়িতে আমি আর তুলতুলি একা। এই সময়টা মায়ের

অভাব খুব অনুভব করি। মা থাকলে কারণে-অকারণে ডেকে ডেকে হারান করত।
সেই হয়রানির জন্য মন কাঁদে।

দিনের অর্ধেকটা কাটে তুলতুলির সঙ্গে। সে কখনও যুগি কখনও শিউলি ডেকে

মায়ের অভাব পূরণ করে।

জীবন এভাবেই কেটে যাচ্ছে। হাতে অখণ্ড অবসর। বারান্দা দিয়ে মানুষের যাতায়াত দেখি। হট-প্যাটিসওয়ালা কাঁচের বাক্সে করে প্যাটিস নিয়ে যায়। ছোট গোল হাওয়াই মিঠাই কিনতে এ বাড়ি ও বাড়ির বাচ্চারা পুরোনো হাঁড়ি-পাতিল নিয়ে হাজির হয়। কাগজে করে চারটা হাওয়াই মিঠাই আমিও কিনেছিলাম। একটা ট্যাপ-খাওয়া কানা পাতিলের বিনিময়ে। গোলাপি মিষ্টি হাওয়াই মিঠাই মুখে দিতেই গলে যায়। আমি খাই, তুলতুলি খায়। জিভে রঙ লেগে মাখামাখি হয়। সেই রঙ তুলতে কতরকম চেষ্টা! ভাবিকে জানানো যাবে না কিছুতেই।

রাস্তায় লোকের অভাব নেই। এতকিছুর মাঝেও সদ্য বিয়ে হওয়া মেয়েটা আর ছেলেটাকে চোখে পড়ে যায়। আমি ওদের ঠিক ঠিক চিনে ফেলতে পারি। একদিন আমারও হবে—সে আশ্বাস আর দিই না নিজেকে। বয়স পঁচিশ পেরিয়ে ছাব্বিশে। বিয়ের প্রস্তাব আসে না আর। আসলেও আমার কান পর্যন্ত পৌঁছায় না। আগে মা ছিল; যার যত প্রস্তাব-লোকে এসে মাকে দিয়ে যেত। এখন মা নেই। প্রস্তাব এলো না গেল সে খবর জানি না।

ভাইয়া ভাবির ভাবসাবে মনে হয় না আমার বিয়ে নিয়ে কোনো আশা আছে। বেতনবিহীন কাজের বুয়া যে-আদরে তুলতুলিকে বড় করছে, সেই আদর বেতনভুক্ত বুয়া দিতে পারবে না।

মাঝে মাঝে মন চায় বলি, ঘর জামাই-ই না-হয় হলো! তবুও আমায় একা রেখো না, প্লিজ!

সংকোচে আর লজ্জায় বলা হয় না। নিজের বিয়ের কথা নিজেই বলি কী করে!

জানুয়ারী ২০১৯

প্রায় দুই যুগ পরে ডায়োরি হাতে তুলে নিলাম। ধুলোর আস্তর পড়া ডায়েরি। উইপোকা কাটা ডায়েরি। আগে সময় পেলেই লিখতে বসে যেতাম। একদিন ডায়েরিটা মায়ের পুরনো সিন্দুকে রেখে তালা মেরে দিলাম। আর লিখব না। কী হবে লিখে? চোখের সামনে শুধু অসীম শূন্যতা দেখি। এই পৃথিবীতে আমার কেউ নেই, কিছু নেই।
মা মারা যাবার পর তুলতুলির পেছনে জীবনটা ব্যয় করে দিলাম। চোখে হারাত আমাকে। বড় হতে হতে ফুপির দাম কমে গেল। সেকেলে ফুপি শুধু সীমা বেঁধে দেয়। ভালো-মন্দের সবক দেয়। আদেশ-নিষেধে আগলে রাখতে চায় সারাটা ক্ষণ। স্বাধীনতার সাদ পেতে আমাকে একসময় দূরে ঠেলে দিল সে।

ছোট্ট বুড়িটা আর ছোট নেই। বছর চারেক আগে জিআরই টোফেল দিয়ে হুলস্থুল

কাণ্ড। আমেরিকায় যাবে পিএইচডি করতে। মেয়ের জন্য যোগা-পাত্র খুঁজে পায় না।

ভাই-ভাবি। একা একা বিদেশ পাড়ি দিচ্ছে, ফুপি হয়ে আমিই বাদ সাধতে গেলাম।

বললাম, বিয়েটা করে যা।

আমার কথা হালে পানি পায়নি। একা একাই পড়তে চলে গেল। তুলতুলির বাস

এখন ঊনত্রিশ। পাত্র খুঁজে খুঁজে হারান তার বাবা-মা। আমেরিকা প্রবাসী উপযুক্ত

পাত্রের অভাব। লোকে যা একটু আগ্রহী হয়, বয়স শুনে পিছিয়ে যায়। বায়োডাটাতেই

এত ব্যাস, আসলে না জানি ।

এর মাঝেই ভাতিজি আমার বিছানায় পড়ে গেল। পিঠে অসম্ভব রাখা হয়। চলাচল

করতে অসুবিধা। আজ খবর এলো মেরুদণ্ডের হাড়ে যক্ষা হয়েছে তুলতুলির। জীবনে

শুনিনি এমন রোগের কথা।

আমার আদরের ভুলতুলি। আমার মতোই নিঃসঙ্গ জীবনে নাম লেখাতে চলছে।

নিজ-হাতে বড় করেছি ওকে। কখনও এতটুকু কষ্ট পেতে দিইনি। এর মা-বাবা

থেকে ওকে কম ভালোবাসিনি। বদদুজা দেবার প্রশ্নই আসে না। তবে কি বুকচেরা

দীর্ঘনিঃশ্বাস তাঁর দরবারে কবুল হয়ে যায়।

বুকটা খানদী করছে। দুলিয়ো আমার একবার সঙ্গী এই জয়েন্টিটা নিছে থেকে তাকে নির্বাসনে পাঠিয়েছিলাম। আহ উপচে-পড়-মুখে সামলাতে না পেরে আবার হাতে তুলে নিলাম।
ও ঘর থেকে ভাবির আর্তনাদ ভেসে আসছে—'ও আল্লাহ্, জীবনে তো কারও ক্ষতি করিনি! আমার মেয়েকেই কেন এত বড় বিপদ দিলে?'

সত্যিই? সত্যিই কারও ক্ষতি হয়নি? আমার অশ্রুভেজা ডায়েরি যে ভিন্ন সাক্ষ্য দেয়।

Inspired Life By Deen 19/08/2023

Islamic Life...❤️🥀

Inspired Life By Deen পার্থিব জীবন তো নিছক ছলনার ভোগ

19/08/2023

দ্বিতীয় বিয়ে

‘দ্বিতীয় বিয়ের ব্যাপারে ভাবছি....

“কিন্তু কেন? আমি কি খুব খারাপ? আমি কি যথেষ্ট ভালো নই? না, না! আমি কখনই দ্বিতীয় বিয়ে মানতে পারি না। আপনাকে আরেকজন নারীর সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিতে পারি না। আপনি চাইলে, আরেকটি বিয়ে করতে পারেন। তবে মনে রাখবেন, দ্বিতীয় স্ত্রী ঘরে আসার সঙ্গে সঙ্গে আমি ঘর ছেড়ে চলে যাবো।।

এই তো, কয়েক বছর আগে যখন স্বামীর মুখে শুনেছিলাম, তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করতে আগ্রহী তখন প্রেম ও আকো-তাড়িত হয়ে ঠিক এ কথাগুলোই বলেছিলাম। আমার এই জোরালো প্রতিবাদের প্রেক্ষিতে তিনি কেবল এতটুকু বলেছিলেন, “ভোগ নয়; মানবতাবোধে তাড়িত হয়েই দ্বিতীয় বিয়ের কথা ভাবছি। যাকে আমি বিয়ে করতে চাচ্ছি, তিনি ষোড়শী কিংবা ধনীর দুলালি নন; বরং সদ্য-তালাকপ্রাপ্তা। চার সন্তানের জননী। ছেলে-মেয়ে নিয়ে খুব কষ্টে তার দিন কাটছে। তার অবস্থ এখন এতটাই শোচনীয় যে, রাত পোহালে মনে হয়, রাতটা আরেকটু দীর্ঘ হলেই ভালো হতো। বাচ্চারা ক্ষুধার যন্ত্রণা ভুলে আরেকটু সময় ঘুমিয়ে থাকত। আর রাত হলে মনে হয়, ভোরের আলো ফুটলেই হয়তো ভালো হতো, বাচ্চাগুলোর জন্য দু'মুঠো খাবারের হয়তো ব্যবস্থা করা যেত।"
আমি বললাম, “কেন? ওদের বাবা কী করে? সে কি বাচ্চাদের দায়িত্ব নিতে পারে না? তাদের দেখাশোনা করতে পারে না? সে নিজেই যদি তার দায়িত্ব পালন না করে, তবে আপনি কেন বাইরের মানুষ হয়ে তার বোঝা বইতে যাবেন? তাছাড়া আপনি যদি তাকে কেবল সাহায্যই করতে চান, তবে বিয়ে করা ছাড়াও সেটা করতে পারেন। তার আর্থিক ব্যয়ভার বহন করতে পারেন। তার জন্য আবাসন বা কর্মসংস্থান করে দিতে পারেন। সাহায্যের এতগুলো সুযোগ থাকতেও বিয়েই কেন করতে হবে?'

বহুবিবাহ মেনে নেওয়ার ব্যাপারটি আমি কল্পনাও করতে পারি না- আমার স্বামীকে আরেকজন নারীর সাথে ভাগাভাগি করতে হবে, আমার প্রতি তার অখণ্ড ভালোবাসাকে খণ্ডিত করে আরেকজন নারী সেটা উপভোগ করবে; আমাকে ছাড়াও তিনি আরেকজন নারীকে স্পর্শ করবেন এবং তাকে ভালোবাসার চাদরে জড়িয়ে স্বপ্নের জাল বুনবেন— অসম্ভব! এটা কিছুতেই হতে পারে না। এটা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না।

এগুলো ভাবতেই চরম ক্ষোভ, দুঃখ ও অপমানের জ্বালায় আমি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছিলাম। আমি তার জন্য কী করিনি? স্ত্রী থেকে শুরু করে প্রেমিকা, সেবিকা, মা, ডাক্তার, গৃহিণীসহ আরও কতজনের ভূমিকা পালন করেছি। এরপরও তিনি কীভাবে আমাকে এতটা অপমান করতে পারলেন? আমার জীবদ্দশায়ই দ্বিতীয় বিয়ের কথা ভাবতে পারলেন?

দ্বিতীয় বিয়ের প্রতি তার এই আগ্রহের কারণে বারবার মনে হচ্ছিল, আমি হয়তো খুব বেশি ভালো না, খুব বেশি সুন্দরী না, কাঙ্ক্ষিত মাত্রার অল্পবয়সী না; কিংবা তার জন্য আমি মোটেই যথেষ্ট না। এজন্যই তিনি দ্বিতীয় বিয়ের কথা বলছেন। কিন্তু আমি তার এই সিদ্ধান্ত কিছুতেই মেনে নিতে পারলাম না। তৎক্ষণাৎ তীব্র প্রতিবাদী কণ্ঠে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলাম—'আপনি চাইলে আরেকটি বিয়ে করতে পারেন। তবে মনে রাখবেন, দ্বিতীয় স্ত্রী ঘরে আসার সঙ্গে সঙ্গে আমি ঘর ছেড়ে চলে যাবো। অতএব, আপনি যদি অপরিচিত এক নারীর জন্য আমাদের বিয়ে, সস্তান ও জীবনের ঝুঁকি নিতে চান, তাহলে সিদ্ধান্তে অটল থাকুন। আমি কিছুতেই যৌথ দাম্পত্যজীবন সহ্য করতে পারব না।”
মনে হচ্ছে যেন কতকাল আগের কথা বলছি! এমন একসময়ের কথা—যখন আমি ভেবেছিলাম—এ জীবন অনন্তকাল ধরে চলতে থাকবে; কোনোদিনও শেষ হবে না...। যেন কখনও কিচ্ছু বদলে যাবে না; বদলাতে পারে না; কিন্তু অদ্ভুতভাবে সবকিছুই বদলে গেল।

আমার স্বামী অবশ্য দ্বিতীয় বিয়ে করেননি। আমার অনড় অবস্থান আর হুমকিতে তিনি পরাজিত হয়েছেন। আমি জানি না—সেই নারী ও তার বাচ্চাগুলোর শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল। বোধহয়, তারা সবাই অন্য কোনো শহরে চলে যায়। তাদের জন্য একটু কষ্ট ও মায়া হয়েছিল বৈকি!

এরপর আমার স্বামী আর কখনই দ্বিতীয় বিয়ের কথা মুখে আনেননি। এ কারণে আমিও ভীষণ আনন্দিত। স্ত্রীর জন্য স্বামীকে বুকে আগলে রাখার চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে! কিন্তু তখনও আমরা কেউ জানতাম না যে, আমাদের সময় খুব শীঘ্রই ফুরিয়ে আসছে...।

একদিন মাগরিবের সালাতের পরে তিনি বললেন—‘খুব মাথা ব্যথা করছে; ইশার সালাত পর্যন্ত শুয়ে থাকব।' এ কথা বলেই তিনি শুয়ে পড়েন। কিন্তু হায়! সে রাতে তার আর ইশার সালাত আদায় করা হয়নি। তার সে ঘুম আর ভাঙেনি। সে-রাতেই তিনি মারা যান।

তার আচমকা মৃত্যুতে আমি একেবারেই হতবিহ্বল হয়ে পড়ি! যে-মানুষটার সাথে সারাটা জীবন কাটিয়েছি, সে হঠাৎ করেই পরপারে চলে গেল। এরপর কতরাত যে একাকী তার জন্য কেঁদেছি—তা কেউ জানে না। হয়তো বা এক মহাকাল জুড়ে!
সে-সময় কোনোকিছু দেখাশোনা করে রাখার মতো অবস্থা আমার ছিল না। অযত্নে, অবহেলায় একে একে সব হারাতে শুরু করলাম। প্রথমে আমাদের গাড়ি, এরপর দোকান, এরপর বাড়ি।

শেষমেশ চিত্র সন্তান-সহ আমি আমার ভাইয়ের বাড়িতে গিয়ে উঠলাম। হ এতগুলো মানুষের উপস্থিতিতে ওদের বাড়িটি গিজগিজ করতে লাগল। আমার

দ্বিতীয় বিয়ে

ভাবিও দিনে দিনে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছিলেন। খুব ইচ্ছে হতো, ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাই। সে-সময় আমার দরকার ছিল একটি চাকরি। কিন্তু বিশেষ কোনো কাজে আমার কোনো দক্ষতা ছিল না।

এভাবে মানুষের দয়ায় কতদিন পড়ে থাকা যায়? নিজেদের জন্য একটি আলাদা বাসার প্রয়োজন খুব বেশি করে অনুভব করছিলাম। যখন আমার স্বামী বেঁচে ছিলেন আমরা কত আরামে ছিলাম। ঘরের বাইরে গিয়ে কাজ করার প্রয়োজনই হতো না; কিন্তু তিনি চলে যাওয়ার পরে জীবন এত কঠিন হয়ে গিয়েছিল যে, আমি প্রতিটি দিন তার অভাব বোধ করতাম। হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দনে তাকে অনুভব করতাম। সমস্ত স্মৃতিজুড়ে তাকে খুঁজে বেড়াতাম। কী করে মানুষের জীবন এত ভয়ানকভাবে পাল্টে যায়, তা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ জানে না!

এভাবেই দিন কাটছিল। হঠাৎ একদিন আমার ভাই আমাকে ডেকে তার এক কলিগের কথা বললেন। তিনি বিয়ের জন্য পাত্রী খুঁজছেন। ভালো মানুষ। চমৎকার আচার-ব্যবহার। দ্বীনদারীও প্রশংসনীয়। তিনি চান, আমি তার দ্বিতীয় স্ত্রী হই। আমার জীবনে দ্বিতীয়বারের মতো দ্বিতীয় স্ত্রী কথাটি শুনলাম; কিন্তু এবারের পরিস্থিতি কত ভিন্ন।

একদিন আমার ভাইয়ের বাসায় আমাদের দেখাদেখির ব্যবস্থা হলো। অবিশ্বাস্যভাবে তাকে আমার খুব পছন্দ হয়ে গেল। তার প্রতিটি ব্যাপারই খুব ভালোলাগছিল। তিনি আমাকে বললেন, তার প্রথম স্ত্রী জানেন, তিনি দ্বিতীয় বিয়েতে আগ্রহী। তবে সে এর বিপক্ষে। তিনি এটাও বললেন, দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে একজনকে খুঁজে পেয়েছেন জানলে তার স্ত্রীর প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে সেটি তার জানা নেই; তবে তার স্ত্রীর বহুবিবাহ মেনে নেওয়ার ওপরেই এখন তার চূড়ান্ত জবাব নির্ভর করছে।

সে-রাতে আমি ইস্তিখারা সালাত আদায় করলাম। আমি পাগলের মতো চাচ্ছিলাম - যেন বিয়ে ঠিক হয়ে যায়। আমার মনে পড়ল, আরেকজন নারীর জীবনও ঠিক এভাবেই আমার সিদ্ধান্তের ওপরে নির্ভর করছিল। মনে পড়ে গেল, আমি কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। হঠাৎ করে অনুতাপে পুড়ে যাওয়ার মতো একটি উপলব্ধি হলো।

বারবার মনে হচ্ছিল, আমি আমার জীবনে আরেকজন নারীকে স্থান দিইনি; তাহলে আল্লাহ কেন আমাকে আরেকজন নারীর জীবনে স্থান দেবেন? নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাকে শাস্তি দেবেন। আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে থাকলাম। অবাক লাগছিলা জীবনে একবার আমার মনে হলো না যে, আমি যে-কাজটি করছি তা কতখানি তুলা আমি সব সময় ভেবে এসেছি—এমন করাটাই ঠিক ছিল।

কিন্তু এখন যখন আমার অবস্থান পাল্টে গেছে, প্রয়োজন যখন এবার আমার, তখন আমি বুঝতে পারলাম, কতটা ভুলে-ই না আমি ছিলাম। আমি আরেকজন নারীর নানী পাবার অধিকার অস্বীকার করেছিলাম।

আদি দুআ করতে থাকলাম, যেন তার স্ত্রী আমাকে মেনে নেন... |

কয়েকদিন পরে তিনি আমাকে ফোন করে জানালেন, দ্বিতীয় বিয়ের ব্যাপারটি মেনে নিতে তার স্ত্রীর খুবই কষ্ট হচ্ছে, তবুও তিনি আমার সাথে দেখা করতে আগ্রহী। আজ তার স্ত্রীর সাথে আমার সাক্ষাতের দিন। আমি তার বাসায় ড্রইং রুমে বসে আছি। ভাবছি, দ্বিতীয় বিয়ে বিষয়টি কেমন! কয়েক বছর আগের কথা মনে পড়ে গেল। আমার স্বামীর সাথে আমার বলা কথাগুলো বারবার মনে পড়ছিল—

“আমি কি খুব খারাপ? আমি কি যথেষ্ট ভালো নই? না, না! আমি কখনই দ্বিতীয় বিয়ে মানতে পারি না। আপনাকে আরেকজন নারীর সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিতে পারি না। আপনি চাইলে আরেকটি বিয়ে করতে পারেন। তবে মনে রাখবেন, দ্বিতীয় স্ত্রী ঘরে আসার সঙ্গে সঙ্গে আমি ঘর ছেড়ে চলে যাবো।”

বসে বসে বোরিং ফিল করছিলাম। খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছিল। আল্লাহর কাছে অনেক দুআ করছিলাম, ‘আল্লাহ, আমাকে সাহায্য করুন, তার স্ত্রীর দিলে আপনি রহম পয়দা করুন, সহীহ বুঝ দান করুন। ইত্যাদি..

তিনি রুমে এলেন। তার অশ্রু ছলছল চোখ স্পষ্টতই বলছিল যে, তিনি আমার মতোই স্বামী অন্তপ্রাণা একজন নারী। তিনিও আমার মতো তার স্বামীকে খুব ভালোবাসেন। তাকে হারাতে খুব ভয় পান। তিনি আমার হাত দুটি ধরে বললেন, 'বোন আমার! আপনি যতই অসহায় হোন না কেন, আমার জন্য এটি মেনে নেওয়া যে ভীষণ কঠিন! তারপরও দুআ কার, যেন আমরা দুজন আপন বোনের মতো থাকতে পারি।
আমি হুহু করে কেঁদে উঠলাম। আমার এই কঠিন সময়ে প্রয়োজন ছিল একটি ভালোবাসাপূর্ণ হৃদয়ের এবং স্নেহমাখা হাতের। যে-হাত আমাকে বুকে জড়িয়ে নেবে এবং যে-ভালোবাসা আমার বেঁচে থাকার ইচ্ছাটিকে বাঁচিয়ে রাখবে। তার শরীর উদারতায় আমি সেটুকু পেয়ে যাই।

তার স্ত্রী আমার জীবনে এমন একজন নারীর দৃষ্টান্ত, যেমন-নারী আমি নিজে কখনও হতে পারিনি। আমি তার প্রতি চিরকৃতজ্ঞ। একসময় ভাবতাম, কেউ তার স্বামীকে নিশ্চয়ই আমার মতো করে এত বেশি ভালোবাসে না। কিন্তু তার স্ত্রীকে দেখে ধারণা পাল্টে যায়। এই মানুষটির কাছ থেকেই আমি নিঃস্বার্থ ভালোবাসার আসল পরিচয় জানতে পারি ।

18/08/2023

চেরিফুল

শীতের সকাল। উইন্টারবুকের তুষার ভেজা রাস্তায় লোকজন নেই বললেই চলে।। গোটা পাড়া ঘুমিয়ে আছে। হিম-শীতল ঠাণ্ডা বাতাসে অদ্ভুত এক ছন্দ তুলে তিরতির করে কাঁপছে আপানি চেরি গাছের পাতা। তারই ধার ঘেঁষে হেঁটে যাচ্ছিলাম খুব সতর্কতায়। তুষার-গলা পিচ্ছিল রাস্তায় বেরসিক জুতো জোড়া প্যাচপ্যাচ আওয়াজ তুলছে। এই বুঝি ভেগে গেল ঘুমন্ত উইন্টারবুক! এ এলাকায় এই আমার প্রথম আনা। হোম নার্সিং এজেন্সিতে চাকুরিটা হয়ে যাবার পর প্রথম কাজ পেলাম উইন্টারকে। আলঝাইমার্স রোগীর দেখাশোনা করতে হবে। রোগীর নাম আহমাদ জোপ। রেকর্ড ঘেঁটে দেখলাম আশি বছরের এই বৃদ্ধ কনভার্টেড মুসলিম। বাপ-দাদারা ধর্ম ছেড়ে ইসলাম পালন করছেন প্রায় বছর চল্লিশ হলো। মুসলিমদের নিয়ে জানাশোনা ছিল না আমার। সত্যি বলতে কোনো ধর্ম সম্পর্কেই শিক্ষা-দীক্ষা পাইনি আমি মনের গহীন থেকে কেউ বলে একজন স্রষ্টা তো নিশ্চয়ই

আছে। আমি তাতে সায় দিয়েছি বটে, তবে এটাকে খোঁজার চেষ্টা করিনি। গহীনের

আওয়াজ গহীনেই ধামাচাপা পড়ে মাছে তেইশটা বছর।
এর মাঝে একজন মুসলিম রোগী পেয়ে খানিকটা চিন্তায় পড়ে গেলাম। তিন বছর বাসে মা-বাবাকে হারিয়েছি। আমাদের, মানে আমায় আর ছোট ভাই পিটারের ঠাঁই হয়েছিল তখন নানাবাড়িতে। চারপাশে যাকেই পেয়েছি, খ্রিস্টান। কখনও জানা হয়নি—মুসলিমদের রীতিনীতি কেমন ছিল। রোগীর চিকিৎসার সুবিধার্থে একটু-আট পড়াশোনা করলাম। জানতে পারলাম মুসলিমরা শূকরের গোশত খা না, মদ ছুঁয়েও দেখে না। দোকান থেকে আহমাদ জোগের জন্য হালাল গোশত কিনেছি তাই। তাকে নিয়ে আমার উদ্বেগে কলিগরা অবাক। তাদের কথা এ রোগী তো আলঝাইমার্সের একদম এডভাগড স্টেজে চলে গেছে। মাঝে মাঝে নিজেকেই চিনতে পারে না। তার ধর্মীয় বিচুয়াল নিয়ে এত ভাববার কী আছে?

গুদের কথায় আহত হয়েছিলাম খুব। একজন মানুষ স্মৃতিভ্রষ্ট বলে কি তার বিশ্বাস নিয়ে খেলা যায়? বারবার আমার নানীর মুখটা ভেসে উঠছিল। শেষ সময়ে তারও আলঝাইমার্স হয়েছিল। আমাকে আর পিটারকে যখন চিনতে পারতেন না, তখন কী যে কষ্ট লাগত। একদম শিশুর মতোন হয়ে যেতেন আমার নানী। যে শিশু বলতে পারে না তার ক্ষিদে পেয়েছে, বুঝতে পারে না তাকে বাথরুমে যেতে হবে। স্মৃতি ফিরলে নানী একদম স্বাভাবিক মানুষ। আমাকে আর পিটারকে চোখে হারাতেন। এই মানুষটা যদি জানতেন এমনও দিন গেছে যেদিন তার কাছে আমি আর পিটার ছিলাম অচেনা আগন্তুক, তিনি কি মেনে নিতে পারতেন? মনে হয় পারতেন না।

আহমাদ ফোল আমার নানীর রোগে ভুগছে। দেখার আগেই মারা পড়ে গেছে লোকটার

জন্য। আজ তার বাড়িতে গিয়েই হালাল বিফের স্ট্যু বানাব। প্রথমে তার আস্থা অর্জন

করা চাই। সে যেন না-ভাবে আমার কাছে তার ধর্মীয় অনুভূতি অনিরাপদ। প্রয়োজন

চিকিৎসা-পদ্ধতি পালটে নেব, তবুও তার ধর্মের সাথে সংঘাতে যাব না।

সারবাঁধা চেরিফুলের গাছ পেরিয়ে রাস্তা যেখানে বামে বাঁক নিল, সেখানেই

আহমান জোন্সের বাড়ি। লাল টালি দেওয়া ছাদের রঙটা জ্বলে গেছে। বাইরে থেকে

বাড়ির দুরাবস্থা দেখে যা ভেবেছিলাম, ভেতরটা তেমন নয়। আমি ঢুকতেই বাতাসে

স্যাম করে দরজা বন্ধ হয়ে গেল। ইজি চেয়ারে বসা বৃদ্ধ চোখ খুললেন।

"জেসিকা। তোমাকে বলেছি না এত আওয়াজ করে দরজা লাগাবে না।।

রোগীর হিস্ট্রি মোটামুটি মনে ছিল আমার। জেসিকা তার মেয়ের নাম। মারা গেছে

বছর দেড়েক হলো।
রুম-হিটারের উচ্চতায় গরম কাপড়ের প্রয়োজন নেই। গায়ের ওভারকোটটা খুলে সোফার একপাশে রাখলাম। বৃদ্ধের কাছে গিয়ে জানালাম আমি ক্যাসি, তার দেখাশোনা করতে এসেছি।

বৃন্য জোন্স কী বুঝলেন কে জানে, আবার চোখ বন্ধ করে চেয়ারে গা এলিয়ে দিলেন। আমিও চলে গেলাম রান্নাঘরে। দ্রুত বিষ্ণু বের করে মশলাপাতি দিয়ে চুলায় চাপালাম। জোলকে স্ট্যু খাওয়াতে একটু বেগ পেতে হলো। আমি বাঁ-হাতি। তাকে খাওয়াতে

বারবার চামচটা বাম হাতে নিয়ে নিচ্ছিলাম। আর ঝোপ কেবল ইশারায় ডান হাত দেখিয়ে

দিচ্ছিল। আন্দাজ করে নিলাম এভাবেই মুসলিমরা খায়। বাম হাতে খাওয়া নিষেধ।

দুপুরে সাক্ষী হলাম এক অদ্ভুত ঘটনার। বৃদ্ধ ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে কী এক অচেনা ভাষা আওড়াচ্ছেন। খানিক বাদে দুই হাঁটু ধরে উবু হয়ে গেলেন। এরপর আবার দাঁড়িয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। অনেকটা ব্যায়ামের মতো, সাথে ভিনদেশি ভাষা। বিকেলে আবারও সেই একই কাজ। পরপর দুই দিন নিয়ম করে এমনটাই করে যাচ্ছেন তিনি। তা-ই নিয়ে কলিগের সাথে কথা বললাম। সে বলল, কোনো মুসলিমের সাথে সরাসরি কথা বলতে। কথায় কথায় এক চ্যাটরুমের সন্ধান পেলাম। সেখানে ধর্ম নিয়ে আলোচনা চলে।

সেই চালিকুম থেকে জানতে পারলাম আহমাদ রোগ ভিনদেশি ভাষায় যে-ব্যায়ামটা করেন, তা নিছক কাউকে দেখে শেখা নয়। সেটা ছিল মুসলিমদের প্রার্থনা। বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল ভীষণ। যে-মানুষটা নিজের হাতে ঠিকমতো খেতে পারে না, নিজের পরিবারের কথাও ভুলে গেছে, সে ঠিক-ঠিক প্রার্থনা করে যাচ্ছে তার স্রষ্টার কাছে। সেদিনই বুঝে গিয়েছিলাম তাকে ভালো রাখার উপায়। একমাত্র ইসলামই তার কষ্ট লাঘব করতে পারে। ইসলাম নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি বাড়িয়ে দিলাম। ভ্যাটরুমে একজন আমাকে তাদের ধর্মগ্রন্থ কুরআনের অনুবাদ পড়তে দিল। সেখান থেকে সূরা

আন-নাহল যে কতবার লাম। বাবারে ধমকে গিয়েছি এখানে।Bযতবার পড়ি হয় ভেঙেচুরে আসে। সৃষ্টি আর এটা সমান হতে পারে না। ভেতর থেকে তাগিদ আসে স্রষ্টাকে খুঁজে নেওয়ার ধামাচাপা দেওয়া বোধগুলো জ্বালাতন করে খুব। আমি এক মনে কুরআন পড়ে যাই। আইপডে তিলাওয়াত শুনি। জানি না কেন চোখ
বেয়ে অশ্রু নামে
দিনকে দিন কুরআন আমার কাছে বিষয়কর এক প্রশ্ন হয়ে ধরা দিচ্ছে। বৃদ্ধ জো

কুরআন শুনলে খুশি হয়, কখনও কাঁদে। অর্থ পড়ে আমিও বুঝে নিই কেন হাসে,

কেনই বা কাঁদে। এই ভদ্রলোকের বাড়িতে পা রাখার আগের দিনটা পর্যন্ত আমি

ভাবতাম- আমি সুখী, আমার পরিতৃপ্ত হত আহমান যোগ আমার ভাবনা

বদলে দিয়েছে। জীবনসায়াহ্নে এসেও তার চোখে-মুখে প্রশান্তির ছাপ ভুল প্রমাণ করে

দিয়েছে আমার। সেই প্রশান্তি আমারও চাই। জানি না- কীসের জন্য প্রাণটা আকুল

হয়ে থাকে। ভীষন খালি খালি লাগে। বারেবারে মনে হয় কী যেন নেই, কী যেন নেই!

[দুই]

চ্যাটমে আজকাল বেশিই সময় ব্যয় করি। রোগীর জন্য ইসলামকে আনতে গিয়ে

কখন যে নিজের জন্যই জানতে শুরু করেছি, টেরই পাইনি। এখানে সবাই সাহায্য

করতে তৎপর। আমাকে স্থানীয় মসজিদগুলোর একটা লিস্ট দেওয়া হলো। সেই

লিস্ট ধরে একটা মসজিদে গেলাম।

দিনটার কথা জীবনে ভুলব না আমি। মসজিদে পা রাখতেই সমস্বরে আল্লাহু আকবার ধ্বনি। আল্লাহু আকবার আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ! কী যে এক অজানা অনুভূতি। মাগুর মতো দাঁড়িয়ে থেকেও কোথায় যেন ভেসে যাচ্ছি আমি। সত্য-মিথ্যা যা-কিছু মিলেমিশে একাকার ছিল, তার সবটা আমার সামনে দু'ভাগ হয়ে ধেয়ে আসছে। যেন বলছে, কোন দিকে যাবে তুমি? টালমাটাল আমি চোখভরা জল নিয়ে মুসলিমদের সা দেখলাম। দেখলাম, একদল মানুষ স্রষ্টার কাছে নিজেকে সঁপে দিচ্ছে।

মসজিদের ইমানের সাথে কথা হলো। সখ্য হলো তার স্ত্রীর সাথে। তারা আমাকে কিছু বই দিলেন, আর কিছু অডিও লেকচার। ইসলাম নিয়ে যা-কিছু আমার ছিল, জেনে নিতে লাগলাম চ্যাটরুম থেকে, কখনও

মসজিদ থেকে। ধীরে ধীরে এমন একসময় চলে এলো, যখন ইসলামকে আকড়ে ধরা ছাড়া আমার আর কোনো গত্যন্তর নেই।

এক সন্ধ্যায় সেই চ্যাটরুমে গেলাম আবার। মাইক্রোফোনে একদার সৃষ্টি আকর্ষণ করল।

"ক্যাসি, তোমার কি কোনো প্রশ্ন আছে?'

না।

'আমি কি জানতে পারি—কোন বিষয়টা তোমাকে ইসলামগ্রহণে বাধা দিচ্ছে?

জবাব দিতে পারলাম না আমি। পরদিন ফজরের সালাত দেখতে েিদ চলে গেলাম। ইমামও চ্যাটরুমের সেই ভাইটির মতো একই প্রশ্ন করলেন। কী আমাকে বাধা দিচ্ছে? কী নিয়ে এন্ড সোটানায় আমি? এবারও নিরুত্তর আমি।

চুপচাপ চলে এলাম আহমাস জোলের কাছে। তাকে খাওয়াতে বসলাম। জবুথবু হয়ে ভদ্র ছেলের মতো খেয়ে নিচ্ছেন তিনি। তার শান্ত চোখের তারায় আমার প্রতিচ্ছবি। সে-ছবিতে। নিজেকে পড়ে ফেললাম যেন। আমি ভয় পাচ্ছি... আল্লাহর কাছে নিজেকে সঁপে দিতে ভয় পাচ্ছি। কোনো অজানা আশংকায় নয়, সত্যকে আলিঙ্গন করতে ভয় পাচ্ছি আমি! আমি কি এর যোগ্য? এই কৃষ্ণ মানুষটার মতো প্রশান্ত হৃদয় কি আমার প্রাপ্য?

বিকেলে আবার গেলাম মসজিদে। শান্ত সুরে ইমামকে জানালাম শাহাদাহ পড়তে চাই। উচ্চারণ করলাম সেই অমোঘ বাণী-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ! আল্লাহ ছাড়া ইবাদতের যোগ্য কেউ নেই, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসূল।

ভেতর থেকে বোঝা নেমে গেল, এখন আমি মুসলিম। মনে হচ্ছিল ছোট অন্ধকার এক গুহায় বন্দি ছিলাম আমি। লা ইলাহা ইল্লাহ বলতে বলতেই গুহামুখের পাথর। সরে যেতে লাগল, আর আমি বুক ভরে শ্বাস নিলাম।

মসজিদ থেকে আমাজোনের বাড়ির পথ ধরেছি। তাকেই আগে জানাব আমার ইসলাম গ্রহণের কথা। এরপর পিটারকে। এখনও জানি না সে কিভাবে নিবে। আশা রাখি পাশেই থাকবে আমার।
উইন্টারবুকের রাস্তাটা নতুন করে দেখছি। প্রথম যেবার এসেছিলাম, তখন

শীতকাল। শীত পেরিয়ে এখন বসন্তের মাঝামাঝি। ন্যাড়া রেডউড গাছটাতে পাতা

এসেছে। ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে জাপানি চেরিগাছগুলো।

চেরিফুল কী অদ্ভুত সুন্দরা সাদাটে ফুলে হালকা গোলাপি আভা। এর মাঝে লাল

রঙা রেণু দেখলে ভ্রম হয়। যেন আচমকা উথলে উঠেছে ফুলের বুক চিরে। চেরিফুলের মিছিলে হাঁটছি আর ভাবছি। গেল শীতেও আমি ছিলাম পথহারা। মাস কতকের ব্যবধানে জীবন কেমন করে বদলে গেল। মনের গহীনে ধামাচাপা দেওয়া সত্যটা ছলকে বেরিয়ে এলো যেন! ঠিক চেরিফুলের রেণুর মতো। একদম হুট করে, আচমকা

17/08/2023

দুই
শাওন কথা রেখেছে। নির্ধারিত সময়ের আগেই সে হাসপাতালে এসে পৌঁছেছে।

গৌরিপুর হাসপাতাল। রোগীদের আসা-যাওয়া এবং চিৎকার-চেঁচামেচিতে গমগম: করছে পুরো হাসপাতাল এলাকা। শাওনকে দেখে একরকম দৌড়ে এলো মামুন। চেহারায় বিষণ্নতার ছাপ। চিন্তা আর অস্থিরতায় শুকিয়ে যেন কাঠ হয়ে গেছে সে। হাঁপাতে হাঁপাতে এসে শাওনকে বলল, 'থ্যাঙ্ক ইউ দোস্ত। অনেক বড় উপকার করলি আজ"। মামুন আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল। তাকে থামিয়ে দিয়ে শাওন বলল, “তোর বউয়ের কী অবস্থা বল।”

*অবস্থা তো ক্রিটিক্যাল। খুবই ব্রিডিং হয়েছে। এজন্যই ব্লাড লাগছে।”

"ব্লাড কখন নেওয়া হবে? জানতে চাইল শাওন।

“একটুপরেই।'

"আচ্ছা" বলেই থেমে গেল শাওন। শাওনের যে অন্য আরেক জায়গায় যাওয়ার

তাড়া আছে ব্যাপারটি মামুনকে জানানো দরকার মনে করল না সে। বিপদগ্রস্ত

মানুষের কাছে বাকি পৃথিবীটাই গৌণ।

ব্লাড দেওয়া শেষে শাওন হাসপাতালের বারান্দায় ফিরে এলো। তাকে দেখে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্না জুড়ে দিল মামুন। শাওনের আজকের উপকারের কথা সে কোনোদিন ভুলবে না, এই প্রতিদানের ক্ষণ কোনোভাবেই শোধ করতে পারবে না সে–ইত্যাদি বলতে বলতে শিশুর মতোই কাঁদতে লাগল সে। তার করা দেখে আশেপাশের লোকজনও ফিরে তাকাচ্ছে ওদের দিকে। হালকা বিব্রত হচ্ছে শাওন, কিন্তু এই মুহূর্তে মামুনকে থামিয়েও দেওয়া যাচ্ছে না। শাওন বলল, “আমার একটু তাড়া আছে। আমি তাহলে আমি এবার।

তার চলে যাওয়ার কথা শুনেই মামুন কাল, 'চলে যাবি মানে? আমার সন্তানের

মুখ দেখে যাবি না?'

শাওন খেয়াল করল সন্তানের কথা বলতে গিয়ে অদ্ভুতরকম পাল্টে গেল মামুনের চেহারা। বিষণ্ণতায় দুইয়ে পড়া মুখাবয়বে হঠাৎ আনন্দের ঝিলিক খেলে গেল। মামুনকে এরকম উৎফুল্ল দেখে শাওন জানতে চাইল 'সন্তানের জন্য খুব অধীর অপেক্ষায় আছিস বলে মনে হচ্ছে?

হেসে ফেলল মামুন। তাকে দেখে বোঝাই যাবে না যে, সে একটু আগে হাউমাউ করে

কেঁদেছে। বলল, "সন্তান যে কী জিনিস তা বাবা হওয়ার আগ পর্যন্ত কোনোদিন বুঝ না।

শাওন চুপ করে রইল। ভাবতে লাগল তার বাবার কথা। সে যেদিন পৃথিবীতে আসে

সেদিন কি তার বাবাও এরকম অধীর আগ্রহে প্রহর গুনেছে সারাক্ষণ। বাবার স্মৃতি

আবছা-আবছা মনে করতে পারে সে। সেই আবছা স্মৃতির সটুকুতে আছে বাবার

আদর। বাবা তাকে কাঁধে তুলে নিয়ে ঘুরতেন। বাবারা বুকের ওপরে ঘুমিয়ে পড়ার কথাও,

কিছুটা মনে পড়ে তার। বাবার হাত ধরে কুলে যাওয়া, আইসক্রিম খেতে খেতে বাসায়

ফেরা—সবকিছু যেন স্মৃতির অতল গহ্বর থেকে হঠাৎ বের হয়ে আসতে চাইছে..

শাব বল, ভাবি কি তোর মতোই উদগ্রীব সনের জন্য?

আবার হেসে উঠে মামুন বলল, কী যে বলিস! বাবার চেয়ে একজন মা-ই তার সন্তানের জন্য সবচেয়ে বেশি উদগ্রীব থাকে। দশ-দশটি মাস পেটের ভেতরে অসহ্য সব যন্ত্রণা সহ্য করে বড় করে তোলে সন্তানকে। ভারতে পারিস, কতটা ত্যাগ থাকে তাতে? একবার কী হয়েছে জানিস? তোর ভাবি একদিন আমাকে বলল, 'যদি সন্তান জন্মের সময় অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, হয় সন্তান বাঁচবে না-হয় মাং তখন কিন্তু তুমি আমার কথা মোটেই মাথায় আনবে না। আমার সন্তানই যেন আমার ওপরে প্রাধান্য পায়। আমি না থাকলেও সে যেন বেঁচে থাকে এই পৃথিবীর আলো-বাতাসে। সেদিন তার কথাগুলো শুনে আমার কান্না চলে এসেছিল। শাওন শুনল কথাগুলো। একজন মা তার সন্তানকে এতটা ভালোবাসে? এতটাই ভালোবাসে যে, নিজের জীবন বিপন্ন করে সন্তানের কথা ভাবতে পারে। অ এই সন্তানের চেহারা পর্যন্ত দেখেনি তখনও। সে আবার ভাবনার জগতে হারি যায়। 'আচ্ছা, আমার মা-ও কি আমার আগমনের সময় এমন উদগ্রীব ছিলেন? আমাকেও তো তিনি দশ-মাস পেটে রেখেছেন। সহ্য করেছেন অসহনীয় সব যন্ত্রণা। আচ্ছা, তখন বাবাকে ডেকে আমার মা-ও কি এমন করে বলেছিলেন? সেই কঠিন। মুহূর্তে আমিও কি তার কাছে তার জীবনের চেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছিলাম?'

কল্পনায় ছেদ পড়ল শাওনের। পাশের অপারেশান থিয়েটার থেকে উচ্চেঃস্বরে ভেসে

আসছে এক নবজাতকের চিৎকার-কান্না। এই কান্নায় বুকটা হয়তো ধড়ফড় করে

উঠল মামুনের। সে এক ভোঁ-দৌড়ে চোখের পলকে চলে গেল ওদিকে। মামুনকে

এমন পাগলের মতো ফুটতে দেখে খানিকটা অবাক হয় শাওন। সাদা পোশাক পরা

একজন নার্স অপারেশান থিয়েটার থেকে বের হয়ে মামুনকে বলল, 'মামুন সাহেব,

আপনার মেয়ে হয়েছে।

মামুনের খুশি আর দেখে কেন খুশিতে সে উচ্চ আওয়াজে কয়েকবার 'আলহামদু লিল্লাহ' বলে উঠল। হাসপাতালে কিছু আত্মীয়-সুজনও এসেছিল ইতোমধ্যে। কাছে যাকেই পাচ্ছিল তাকেই আনন্দে জড়িয়ে ধরছিল মামুন। সন্তানের জন্য মামুনকে এমন উৎফুল্ল দেখে শাওনের ভেতরে এক নতুন অনুভূতির সৃষ্টি হয়। সেই অনুভূতি শাওনকে চমকিত করে, ভাবিত করে।

[তিন]

বাইরে বেরিয়ে এলো শাওন। সকালের সোনা রোদ এখনও মিলিয়ে যায়নি। এই মুহূর্তে তার ক্যাম্পাসে চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু কোনো এক কারণে আজকে তার ক্যাম্পাসে যেতে মন চাইছে না কোনোভাবেই। তার স্মৃতিতে শুধু ভেসে উঠছে তার বাবার আবা চেহারা। মনে পড়ছে মায়ের কথা। আর সকালেও মাকে সে শাসিয়েছিল। প্রতিদিনই এমন আচরণ করে সে তার মার সাথে। কেন জানি তার ভেতরে খুব অপরাধবোধ কাজ করছে এখন। তার মন চাচ্ছে মাকে গিয়ে জড়িয়ে ধরতে। জড়িয়ে ধরে মামুনের মতো হুহু করো কাঁদতে পারলে তার ভালোলাগতে হতো...

[চার]
ঠক.......ঠক.......ঠক.......
দরজা খুলে দিলেন রাহেলা বেগম। দরজার সামনে শাওনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি বেশ অবাকই হলেন। ওর তো আসার কথা ছিল না এখন। কোনো সমস্যা হয়েছে কি? রাহেলা বেগম খেয়াল করলেন, শাওন তার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার সেই দৃষ্টিতে কোনো বিরক্তি নেই। কোনো তাচ্ছিল্য নেই। ছেলের চোখের এই চাহনির সাথে রাহেলা কোম খুব অপরিচিত। ছেলের কোনো বিপদ হয়েছে কি না—এমন এক অজানা শঙ্কায় কেঁপে উঠল তার বুক।

হঠাৎ মায়ের পায়ে লুটিয়ে পড়ল শাওন। রাহেলা বেগমের পা দুটি জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে সে কাঁদতে আরম্ভ করল। খুব অবাক হয়ে গেলেন রাহেলা বেগম। ছেলের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে জিজ্ঞেস করেন তার কী হয়েছে? এমন করছে কেন? কোনো সমস্যা হয়েছে কি না....

শাওন কিছুই বলছে না। শুধুই কাঁদছে। শিশুদের মতো মায়ের গলা জড়িয়ে কাঁদতে থাকা শাওনকে আদর করে গালে চুমু খায় রাহেলা বেগম। তিনি বুঝতে পারেন শাওনের বোধ জেগেছে। একপ্রকার হারিয়ে যাওয়া ছেলেকে তিনি আবার ফিরে পেয়েছেন। রাহেলা বেগমের ইচ্ছে করছে এই মুহূর্তে জায়নামায বিছিয়ে দুআ করতে। কেননা, ছেলেকে নিয়ে এভাবেই তার হাজার বছর বেঁচে থাকতে ইচ্ছে হয়...

Want your business to be the top-listed Beauty Salon in Maulvi Bazar?
Click here to claim your Sponsored Listing.

Category

Culinary Team

Attire

Telephone

Website

Address


Moulovibazar Polli Biddut Samity, Sreemongol, Moulovibazar
Maulvi Bazar
3900